আজ বৃহস্পতিবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

ঘুষ প্রতিরোধ শুদ্ধি অভিযানের অন্তর্ভুক্ত হোক

  • আপডেট টাইম : November 26, 2019 9:58 AM

সালেক উদ্দিন : আমাদের একটি সহজাত ধর্ম হলো—যার সঙ্গে বসবাস করছি, সেটাকে আমরা আমাদের নিয়তি বলে মেনে নেই। কোনও উচ্চবাচ্য করি না। কিন্তু বিদেশের কোনও গবেষণা থেকে যদি আমাদের সেই অতিপরিচিত ত্রুটিগুলো বেরিয়ে আসে এবং এর কুফলকে তুলে ধরা হয়, তখনই সেদিকে চোখ রাখি এবং শুরু হয় উচ্চবাচ্যের বিষয়টি। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এমনই একটি বিষয় ঘুষ। দুয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘুষ ছাড়া এদেশে কোনও কাজ হয় না, এটাই সত্য। অতি ক্ষুদ্র কাজ থেকে শুরু করে সর্ববৃহৎ যে কাজটিকেই চিহ্নিত করুন না কেন, সেগুলো সম্পাদনের জন্য ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় ঘুষ লেনদেনের।
গত সেপ্টেম্বরে টিআইবির জরিপে উঠে এসেছিল ‘ঘুষ ছাড়া সেবা পায় না ৮৯ শতাংশ মানুষ’। এতে আমরা উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু মনে না করলেও বা বিষয়টি আমাদের গা সওয়া হয়ে গেলেও যখন কানাডা থেকে নিবন্ধিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঘুষবিরোধী ব্যবসা সংগঠন ট্রেস-এর একটি প্রতিবেদন ‘ট্রেস ব্রাইবারি রিস্ক মেট্রিক্স’ প্রকাশিত হলো এবং তাতে দেখা গেলো পৃথিবীতে ঘুষের ঝুঁকি সবচেয়ে কম নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে ও ডেনমার্কের মতো উন্নত দেশে, আর সবচেয়ে বেশি সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে। বাংলাদেশের অবস্থানও সোমালিয়া, সুদান, উত্তর কোরিয়ার খুব কাছাকাছি। শুধু তাই নয়, ঘুষ লেনদেনে বিশ্বের ২০০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৮তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে বাজে, আর ভুটানের অবস্থা সবচেয়ে ভালো। তাদের অবস্থান ৫২তম স্থানে। তখনই শুরু হলো নানাজনের নানাকথা। দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো গুরুত্বসহকারে সেই প্রতিবেদনের সারমর্ম প্রকাশ করলো, বিষয়টি সম্পাদকীয়তে উঠে এলো। কলামিস্টরাও বসে রইলেন না। আমার মতো অনেকেই শুরু করলেন এই নিয়ে একটি কলাম লেখার।

‘ট্রেস ব্রাইবারি রিস্ক মেট্রিক্স’ প্রতিবেদনে ২০০টি দেশের মধ্যে দুর্নীতিতে জর্জরিত দেশগুলোর পয়েন্ট তালিকায় প্রায় শেষ দিকে আমাদের অবস্থান। ২০০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বাজে অবস্থানে থাকা সোমালিয়া, সুদান ও উত্তর কোরিয়া খুব কাছাকাছিই রয়েছি আমরা। সূচক অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ঘুষ লেনদেন ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ১০০’র মধ্যে ৭২ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ১৭৮তম স্থানে। এরপর রয়েছে আফগানিস্তান। ৬৬ পয়েন্ট নিয়ে তাদের অবস্থান ১৬৮। পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৩, মালদ্বীপের ১২৪, নেপাল ১১৬তম। শ্রীলঙ্কা ও ভারতের অবস্থান যথাক্রমে ১১১ ও ৭৮তম স্থানে। প্রতিবেদনের সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে যে দেশের পয়েন্ট বেশি, সে দেশের ঝুঁকি বেশি সেই অনুসারে।

ঘুষ ছাড়া এদেশে কোনও কাজ হয় না এমন কথা সমাজে যেমন প্রচলিত আছে, তেমনি ট্রেসের প্রতিবেদনেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। ঘুষ বাংলাদেশের জন্য নতুন বিষয় নয়। অনেক পুরাতন এবং অতি পরিচিত বিষয়। বাংলাদেশের দৈনিক পত্র-পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবসময়ই ঘুষবিষয়ক কোনও না কোনও খবর থাকছেই। খবরগুলোর দুয়েকটি শিরোনাম এখানে তুলে ধরা যাক। যেমন—‘কনস্টেবল নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য, পুলিশ সদস্য গ্রেফতার’, ‘এক বিদেশির কাছে ঘুষ চেয়ে ফেঁসে গেল বেচারা পুলিশ’, ‘ঘুষ যেন চিরায়ত অনিয়ম, দেখেও দেখে না কেউ’, ‘উপজেলা কর্মচারীদের লাগামহীন ঘুষ বাণিজ্য’, ‘শিক্ষায় পদে পদে ঘুষ’, ‘কনস্টেবল নিয়োগে কোটি টাকার বাণিজ্য: মাদারীপুরের এসপির দেহরক্ষীসহ চারজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’, ‘বাংলাদেশ বিমানের লিখিত পরীক্ষার প্রার্থী যাচাই বাছাই পর্যায়েই ঘুষ বাণিজ্য’।
ঘুষ সংক্রান্ত বর্ণিত সংবাদপত্রের শিরোনামগুলো বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি শুধু দুয়েকটি বিশেষ জায়গায় বিরাজ করছে না। এর দৌরাত্ম্য অজপাড়াগাঁ থেকে শুরু করে রাজধানীর সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের মানুষের ঘুষ দুর্নীতির বিষয়টি জানতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ট্রেসের গবেষণার প্রতিবেদন প্রয়োজন পড়ে না। তাদের অভিজ্ঞতা ট্রেসের গবেষণার চেয়েও অনেক অনেক বেশি।

ব্যবসা-বাণিজ্যের কথাই ধরা যাক, বাংলাদেশে ফুটপাতে চটপটির ব্যবসা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সব ক্ষেত্রেই কাউকে না কাউকে ঘুষ দিতেই হয়। ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় জড়াতে হয়। একটু বৃহৎ অর্থে বলতে গেলে বলতে হয়, বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, রাজনীতি, সামাজিক খাতসহ এমন কোনও খাত নেই, যেখানে ঘুষ বাণিজ্যের অবাধ বিচরণ নেই। ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী ব্যবসা তো ঘুষ ছাড়া চলেই না। শুধু কী তাই? ঘুষের দাপটে এখানে তথ্য সন্ত্রাসও চলে, চলে হলুদ সাংবাদিকতা, সরকারি সম্পত্তির অবৈধ দখল, ভূমি দস্যুতা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মামলাবাজি, দলবাজি ইত্যাদি।
অল্প কথায় যদি বলি, তবে বলতে হবে দেশের সার্বিক উন্নতি এবং এর সুফল বৃহত্তর জনগণের কাছে পৌঁছানোর প্রধানতম অন্তরায় হচ্ছে এই ঘুষ বাণিজ্য বা ঘুষের দুর্নীতি। দুর্নীতির তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে আছে ঘুষ। ঘুষের দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। জাতির উন্নয়নের জন্য যে পরিকল্পনাই করা হোক, ঘুষ প্রতিরোধ না হলে তা সফল হবে না। এর প্রতিরোধ না হলে পুরো দেশই দুর্নীতিগ্রস্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। ঘুষ জাতির উন্নয়নের ক্যানসার। উন্নয়নের রাজনীতিতে একে রোধ করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

দেশে ক্যাসিনো উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যে শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তা সর্বস্তরের মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছে। শুদ্ধি অভিযানে বিষয়বস্তুর মধ্যে ঘুষ নির্মূল অভিযান সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্তিকরণ সময়ের দাবি। সর্বস্তরে ঘুষ নির্মূলের জন্য গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে শুরু করে যা যা করা প্রয়োজন, তাই করার জন্য সরকারকে যুগোপযোগী পরিকল্পনা নেওয়ার এখনই সময় এবং তা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই ঘুষ-দুর্নীতির হাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সাধারণ মানুষের সেটাই প্রত্যাশা।

(লেখক: কথাসাহিত্যিক।)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ