আজ বৃহস্পতিবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

যে কারনে টেস্টে হারল টাইগাররা

  • আপডেট টাইম : November 26, 2019 1:22 PM

ক্রীড়া ডেস্ক : ভারত সফরে দুই টেস্টেই ইনিংস ও রানের ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। এর আগে ঘরের মাঠে ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে কনিষ্ঠ দল আফগানিস্তানের কাছে পরাজিত হয়েছেন তারা। শুধু সাম্প্রতিক সময়েই নয়, টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর থেকেই এ ফরম্যাটে টাইগারদের পারফরম্যান্স হতাশাজনক।

২০০০ সালে প্রথম টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। ক্রিকেটের লংগার ভার্সনে দলের বয়স ২০ বছর হতে চললেও এখনো উন্নতি ঘটেনি। এখন পর্যন্ত ১১৭ টেস্ট খেলেছে টিম টাইগার্স। ৮৮টিতেই হেরেছেন তারা। এর মধ্যে ৪২টিতে ইনিংস ব্যবধানে হার। জিতেছে ১৩, ড্র ১৬টিতে। তবে কোনো টাই নেই।

ক্রিকেটবোদ্ধা থেকে শুরু করে ক্রিকেটপ্রেমীরা পর্যন্ত একে বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন। তো এমন ভরাডুবির কারণ কী? সাতটি কারণ তুলে ধরা হলো-

ঘরোয়া ক্রিকেটে অনীহা
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার অনীহা রয়েছে। ঘরোয়া লিগে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ঠিকই খেলেন তারা। তবে বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ খেলেন না। দীর্ঘ ফরম্যাটের অনুশীলনটা আলাদা। এখানে শুধু ভালো ক্রিকেটার হলেই হয় না, লম্বা সময় উইকেটে থাকতে হয়, ব্যাটিং করতে হয়। তিন দিন-চার দিনের ম্যাচে দেখা যায়, বেশিরভাগ দক্ষ ক্রিকেটার বিশ্রাম নেন অথবা অন্য কোনো খেলায় ব্যস্ত থাকেন। এ ছাড়া পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, দেশ-বিদেশে ঘুরতে যান।

নিম্নমানের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো
ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট যেভাবে হয়, তাতে খেলোয়াড়রা টেস্টের জন্যে প্রস্তুত হতে পারেন না। অধিনায়ক তৈরি হয় না। স্থানীয় কোচদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। কোনো দলই জেতার জন্য খেলে না। ভালো মানের বল-ব্যাট সরবরাহ করা হয় না। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করছে বোনাস পয়েন্ট সিস্টেম। প্রথম ইনিংসে লিড নিতে পারলে বোনাস, সাড়ে তিন/চারশ রান করতে পারলে বোনাস পাওয়া যায়। যে কারণে জেতার প্রতি আগ্রহ কম থাকে।

ক্রিকেটার ও কোচদের অনেকেই টেস্ট ক্রিকেট কী, তা বোঝেন না। সেই অর্থে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ কিংবা টুর্নামেন্ট হয় না। থানা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়মিত ক্রিকেট হয় না। ফলে খেলোয়াড় বেরিয়ে আসছে না। কারো মধ্যে টেস্ট খেলার মানসিকতাও তৈরি হচ্ছে না। অধিকন্তু স্কোর হয় ছোট, ৪০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ বাইরের দেশে চার দিনের ম্যাচে দলীয় রান ৭০০-৮০০ ছাড়িয়ে যায়। এক ব্যাটসম্যানই ইনিংসে করেন ২০০-৩০০ রান। সে রকম কোনো ব্যাটার দেশে গড়ে উঠছে না।

অধিনায়কত্বে সমস্যা
আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের কেউই অধিনায়কত্ব করতে চান না। এ সমস্যা অবশ্য অন্য দুই সংস্করণেও রয়েছে। দীর্ঘ পরিসরে পদচারণা দেড় যুগের বেশি হলেও ভালো মানের অধিনায়ক পাওয়া যায়নি। এর একটিই কারণ– কেউ সেভাবে গড়ে উঠেননি। ফলে মাঠে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যে টেম্পারমেন্ট, ধৈর্য, টেকনিক লাগে তা আয়ত্তে নেই। মাঠের খেলায় অ্যাপ্লিকেশনে প্রায়ই ভুল করেন তারা।

স্পিননির্ভর উইকেট
২০১৬ সালে ইংল্যান্ড এবং ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজে একটি করে ম্যাচ জেতে বাংলাদেশ। দুই সিরিজের জন্যই তৈরি করা হয় স্পিননির্ভর উইকেট। ঘরোয়া ক্রিকেটের উইকেটগুলোও স্পিনসহায়ক। এতে স্পিনাররা ভালো করলেও পেসাররা পারেন না। এক অর্থে ফাস্টবোলাররা বল করারই সুযোগ পান না। কারণ এখানে ম্যাচ জয় ঘাড়ে চেপে বসে।

পরিকল্পনার অভাব
টেস্ট ক্রিকেটের উন্নয়নে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছে না। উঠতি ক্রিকেটারদের যত্ন নেয় গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগ। এখানে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। দেশের ক্রিকেটে এর ছিটেফোঁটাও নেই। এ জন্য যথাযোগ্য ম্যানেজার নেই। ডেভেলপমেন্টের বর্তমান ম্যানেজার ক্রিকেটের টেকনিক্যাল কোনো লোক নন। অতীতে এ দায়িত্ব পালন করেন ক্রিকেট মস্তিষ্ক নাজমুল আবেদীন ফাহিম। তার তত্ত্বাবধানে উঠে আসেন তামিম, মুশফিক, সাকিবরা। সদ্য তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়া দেয়া হয়েছে।

দল নির্বাচন
টেস্ট দলে পেসার ও স্পিনারদের মধ্যে কোনো সমন্বয় থাকে না। কোনো ম্যাচে পেসারই থাকেন না। ফলে স্পিনাররা যখন অকার্যকর হন, তখন বিকল্প কাউকে ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। এ ছাড়া সুইং, বাউন্স, বাড়তি গতি দেয়ার মতো পেসারও দেশে নেই। এ জন্য ক্রিকেট কাঠামোই দায়ী। পেস বোলার তৈরিতে মনোযোগ নেই। একজন আন্তর্জাতিক মানের পেসার তৈরিতে যে বিনিয়োগ দরকার সেটি নেই। তাদের জন্য নিয়মিত অনুশীলন, ঘাসযুক্ত পিচ দরকার, ভালো বোলিং কোচ দরকার-সেটির বড্ড অভাব রয়েছে।

সিনিয়র নির্ভরতা
বরাবরই বাংলাদেশের ক্রিকেট সিনিয়রদের ওপর নির্ভরশীল। দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা ব্যর্থ হলে তরুণরা হুড়মুড়িয়ে পড়ে। সেই চিরাচরিত প্রথা থেকে বের হতে পারেননি টাইগাররা। উদীয়মান, সম্ভাবনাময়ী ও প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটাররা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন না।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ