আজ বৃহস্পতিবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

গোছাতে গিয়ে তছনছ সিলেট আ.লীগ

  • আপডেট টাইম : December 2, 2019 12:07 PM

অতিথি প্রতিবেদক : সম্মেলন ও নতুন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগ সাজাতে গিয়ে উল্টো তছনছ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে সিলেট আ’লীগ। তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, নতুন কমিটিতে খুনের মামলার আসামি, স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান ছাড়াও অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়েছে। শুধু ঢুকে পড়া নয়, শীর্ষ পদও পেয়েছেন অনেক বিতর্কিতরা।

বিতর্কিত আরও কয়েকজন নেতা শীর্ষ পদ বাগিয়ে নিতে মরিয়া। অনেকের অভিযোগ, তৃণমূলের নেতৃত্বে বিতর্কিতরা পুরস্কৃত হচ্ছেন, বঞ্চিত হচ্ছেন দলের ত্যাগী ও নিবেদিতরা। কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরেই তৃণমূলে বিরাজ করছে চরম অসন্তোষ। তোলপাড় চলছে মাঠে।

এর প্রভাব পড়ছে ৫ ডিসেম্বরের জেলা ও মহানগরীর সম্মেলনেও। সিলেট সফরে থাকা সিলেট-১ আসনের এমপি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেন, সবার মতামতের ভিত্তিতেই সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হবে। যোগ্যরাই নেতৃত্বে আসবেন।

কান্দিগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিনকে সভাপতি ও মোগলগাঁও ইউপির চেয়ারম্যান প্রবাসী হিরণ মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে সিলেট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল সোমবার।

বিদ্রোহের মুখে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই কমিটি স্থগিত করা হয়। বৃহস্পতিবার আগের কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মফিজুর রহমান বাদশাহ ও সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিনকে ফের দায়িত্ব দিয়ে সদর আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ফলে সম্মেলনের পর ঘোষিত নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে হিরণ মিয়া বাদ পড়েন।

সিলেট সদরের খাদিমনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি তেরা মিয়া বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের নেতৃত্ব আমরা কেউ মেনে নিইনি। তাই প্রতিবাদের মুখে অনুপ্রবেশকারীকে অপসারণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, মোগলগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিরণ মিয়া ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ক্রয়ডন শহর শাখা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তাকে নতুন কমিটির শীর্ষ দায়িত্ব দেয়ায় সংগঠন তছনছ হওয়ার পরিস্থিতি হয়েছিল। কমিটি থেকে অপসারণের পর হিরণ মিয়া মোবাইল বন্ধ রেখেছেন।

এদিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি হয় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। অথচ কমিটি ঘিরে ক্ষোভের আগুন এখনও নেভেনি। আলী আমজাদকে সভাপতি ও আফতাব আলী কালা মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়।

এতে সহ সভাপতি হন জয়নাল আবেদীন, কাজী আবদুল ওদুদ আলফু মিয়া, হুমায়ুন কবীর মছব্বির, আবদুল ওদুদ ও রফিকুল হক। এ কমিটির শীর্ষ পদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে হত্যা মামলার আসামিরাও জায়গা পেয়েছেন! অথচ সেই কমিটিতে স্থান হয়নি আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের জন্য শেখ হাসিনার নামে ভূমিদানকারী প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা কবির আহমদের।

জানতে চাইলে কবির আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছি। বঙ্গবন্ধু ও নৌকার জন্য রাজনীতি করি, কখনও পদ-পদবির জন্য নয়। আর এজন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে জমি দিয়েছি দলের অফিসের জন্য। এখনও ওই ভূমির খাজনা দিয়ে যাচ্ছি। অবশেষে এবারই প্রথম আমাকে কমিটি থেকে বাদ দেয়া হল, এটা মনে বড় কষ্ট দেয়।

কানাইঘাটে আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্থান পাওয়া দূরের কথা দাওয়াতই দেয়া হয়নি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক জমির উদ্দিন প্রধানকে। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা তার বাড়িতে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজেই তাকে ‘প্রধান’ উপাধি দিয়েছিলেন। ১১ নভেম্বর কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দাওয়াত না পাওয়া জমির উদ্দিন প্রধান বলেন, আজ দলে নেতাকর্মীর অভাব নেই।

এক সময় জীবন বাজি রেখে আমাদেরই দলের হাল ধরতে হয়েছিল। সারা জীবন যে দলের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করেছি, যে দল করে জীবন পাড়ি দিয়েছি, সেই দলের সম্মেলনের দাওয়াতটুকু পাওয়ার অধিকারও এখন আমাদের নেই। এটা আমাকে অপমান করা নয়, আমি মনে করি মুজিব আদর্শের সব ত্যাগী নেতাদের অসম্মান করা।’

গোলাপগঞ্জ ও জৈন্তাপুরে সম্মেলন শেষ হলেও কমিটি ঘোষণা নিয়ে বিপাকে জেলার নেতারা। এরমধ্যে গোলাপগঞ্জে কমিটি করতে গিয়ে পুলিশি প্রহরায় ফিরতে হয়েছে সম্মেলনের অতিথিদের। গোলাপগঞ্জের নেতারা একাট্টা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সুবিধাভোগী সৈয়দ মিসবাহর বিরুদ্ধে। তারা সৈয়দ মিসবাহকে সাধারণ সম্পাদক পদে মেনে নিতে নারাজ। অনেকটা একই অবস্থা জৈন্তাপুর আওয়ামী লীগে।

সেখানে রাজাকারপুত্র লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতারা। ফলে সম্মেলন হলেও কমিটি ঘোষণা হয়নি এখনও। লিয়াকতকে সংগঠনের শীর্ষপদে দেখতে চায় না স্থানীয় আওয়ামী লীগ। জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন- ত্যাগী, নিবেদিত নেতারা কমিটি থেকে বাদ পড়ে থাকলে তাদের কমিটিতে কোঅপ্ট করা হবে।

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, দলের সভানেত্রীর নির্দেশনা অনুসারে কমিটি গঠন হলে এসব সমস্যা হতো না। নির্দেশনা অনুসরণ না করার কারণেই কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী, বিতর্কিতরা ঢুকে পড়ছে।

ঝামেলা হচ্ছে এদের নিয়েই। জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক জগলু চৌধুরী জানান, উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কমিটি গঠন প্রায় শেষ পর্যায়ে। ১৩ উপজেলার মধ্যে গোলাপগঞ্জ ও জৈন্তাপুর ছাড়া বাকি ১১ উপজেলাতেই কমিটি হয়ে গেছে।

তিনি জানান, জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে ৬ উপজেলার কমিটি করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। বাকি উপজেলাগুলোর কমিটি হচ্ছে এবার। সিলেট সদরে কমিটি হলেও স্থগিত হয়ে গেছে। তাই এখানেও নতুন করে কমিটি ঘোষণা হবে।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ