আজ শুক্রবার, ৭ই আগস্ট, ২০২০ ইং

বড় বাড়ির ভোজ!

  • আপডেট টাইম : December 8, 2019 9:49 AM

তুষার আবদুল্লাহ : শুক্রবার বাজার সফরে বেরিয়েছিলাম। নিজে কেনাকাটা করিনি। ক্রেতাদের পেছন পেছন হেঁটেছি। দর-দামের সময় পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পকেট উপচানো ক্রেতারা আসলেন, দাম নিয়ে কোনও কথা নেই। যে পণ্যটি কিনছেন, তা বাজারসেরা কিনা, সেটাই আসল কথা। মাছ সদ্য নদী থেকে আসা, সবজি থেকে ভোরের শিশির তখনও ঝরে যায়নি। এমন নিশ্চয়তায় ক্রেতা সন্তুষ্ট, বুক স্ফীত। পেঁয়াজ, আদা, রসুন এবং চালের দোকানেও তারা খোশ মেজাজেই ছিলেন। কত আর দাম বাড়লো। উড়োজাহাজে আসা পেঁয়াজের মান-সম্মানের দিকটাও যে দেখতে হবে। পেঁয়াজের দামের সঙ্গে আত্মীয় আদা রসুনের দাম কেন কম হবে? আর নবান্নের মৌসুমে বেশি দামে চাল কেনার মধ্যেও আছে নির্মল আনন্দ। শীত না আসতেই বাজারে চলে এসেছে সবজি। আগাম চলে আসার বাড়তি মাশুল দাবি করাটাকেও অনৈতিক বলা হবে? মোটেও না, এসব আবদার অজুহাত কবুল করেই বিত্তরাজদের বাজার জয় সইয়ে যেতে হলো।
মধ্যমবিত্তের ক্রেতা এসে বাজারে আড়চোখে বিত্তরাজদের দেখে। একই কায়দায় বিক্রেতার দিকে হাঁক দিয়ে উঠতে চায়, হাতের তর্জনী একই কায়দায় উঠে আসতে থাকে। কিন্তু পেঁয়াজের কাছে, চালের কাছে এমনকি মাছের সামনে এসে নত হয়ে যায় কণ্ঠ, পতন হয় তর্জনীর। পেঁয়াজের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বড়জোর দুই ডজন ব্যাগে তুলে নিতে পারে। ফর্দতে লেখা ছিল যতটুকু, চাল কেনা হলো তারচেয়ে খানিক কম। ডেকচিতে চাল এখন থেকে দিতে হবে কম কয়েক মুঠো। মাছবাজারে গিয়ে চোখ ছানাবড়া। কত মাছ। কী যে তার স্বাদ। কিন্তু পকেটে আছে টান। তাই এক, দুই পদ আধা কিলোর সীমা পেরোতে পারে না। সবজিবাজারে ফুলকপি দেখে মন প্রফুল্ল নয়, হয় বিষণ্ন। এক ফুল তুলে নিতে শতক নোটের প্রায় যেন পুরোটাই যায়। শাকপাতা খেয়ে বাঁচা, তারই বা সাধ্য কই? পাতা দুই তুলতেই, খসে পড়ে কড়ি কুড়ি দুই!

নিম্ন আর সর্বহারাদের কথা আর কী বলি। বাজারে দেখা হয়েছে তাদের সঙ্গে। তারা যে খালি হাতে ফিরেছেন, তা নয়। তবে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে দুর্বল হয়ে যাওয়া পেঁয়াজ, কঙ্কালসার আদা, শরীরের কালি পড়ে যাওয়া রসুন, পচনের ঝুঁকিতে থাকা মাছ তরকারি নিয়ে তারা ফিরেছেন। তবে তিনবেলা পেটপুরে তৃপ্তির ভোজন যে হবে না, তা তাদের চোখমুখ আর গরিবি থলে দেখেই বোঝা গেছে।

গত ছয় পক্ষের বাজার সফরের অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে—দেশের আপামর জনতার, যার মধ্যে বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের এখন বড়লোকের বাড়িতে ভোজ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। এক সময় চীনে এমন ভোজ উৎসব হতো। মাও সে তুং শৈশব পার করছেন তখন। ওই সময়ে চীনে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। চালের সংকট ছিল। যতটা না উৎপাদন কম হয়েছিল, তার চেয়ে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিলেন বেশি। গরিবেরা অনাহারে মরতে থাকে আর বড়লোকেরা আরও বেশি দামে চাল বেচে আরও ধনী হতে থাকে। নাগরিকেরা প্রদেশ পালের কাছে এ বিষয়ে সাহায্য চাইলে বলা হয়—শহরে তো প্রচুর চাল আছে। আমার কাছে দেখো আমার কাছে প্রচুর জিনিস আছে। এই বিদ্রূপের প্রতিবাদে নাগরিকেরা একেকদিন একেক বড়লোকের বাড়ি গিয়ে চাল ও অন্যান্য জিনিস বের করে এনে ওই বাড়িতে রান্না করে সবাই মিলে খেয়ে নিতো।

পেঁয়াজ, লবণ, তেল, চালের বেলায় বাংলাদেশেও একই কাণ্ড ঘটছে। দাম যখন উড়ন্ত, তখনও মন্ত্রী এবং তাদের পারিষদরা বলে যাচ্ছেন, দাম কবে কমবে তারা জানেন না। বাজার নিয়ন্ত্রণের দরকার নেই বলেও তারা মন্তব্য করছেন। এই প্রশ্রয়ে বাজার পাহাড়সমান বড়লোক ছাড়া আর কারও সাধ্যের মধ্যে থাকবে কিনা সন্দেহ। তখন আম মানুষের বিকল্প থাকবে শুধু ‘বড় বাড়ির ভোজ’ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার!

(লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি।)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ