আজ শনিবার, ২৫শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং

আদব-বেয়াদব চলছে লড়াই!

  • আপডেট টাইম : December 8, 2019 9:51 AM

রেজানুর রহমান : ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এই সতর্কবাণী লেখা থাকে সিগারেটের প্যাকেটে। প্রকাশ্যে ধূমপান করলে জরিমানার আইনও দেশে আছে। এই সতর্কবাণী ও আইনের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই দ্বিমত কিংবা ভিন্নমত পোষণ করি না। তবে, একই অপরাধের জন্য ছাত্ররা পার পেয়েছে যাবেন, আর ছাত্রীরা শাস্তি পাবেন, এই রীতির বিরুদ্ধে আমার অবস্থান।
পত্রিকায় ছোট একটি খবর বেরিয়েছে। ধূমপানের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই আবাসিক ছাত্রীর সিট বাতিল করা হয়েছে। খবরটি কয়েকবার পড়লাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ধূমপান করলে হলের সিট বাতিল হবে এমন আইন কি কোথাও আছে? যদি লেখা না থাকে, তাহলে ধূমপানের দায়ে তাদের হলের সিট বাতিল হবে কেন? সরল মনে একটা সরল প্রশ্ন দেখা দিলো। আচ্ছা, ধূমপানজনিত এই অপরাধে কোনও ছাত্রের কি শাস্তি হবে? অথবা হয়েছে কোনোদিন? তাহলে ছাত্রীদের শাস্তি হবে কেন? কোথাও কি বলা আছে—ছাত্রীরা ধূমপান করতে পারবেন না? ছাত্ররা যদি সিগারেট টানতে পারেন, তাহলে ছাত্রীরা পারবেন না কেন? আমরা যখন সমঅধিকারের কথা বলি, তখন তো ছেলে-মেয়ে সবার ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য হবে। ছেলেরা ডিমের কুসুম খাবে, মেয়েদের ভাগ্যে কিছুই জুটবে না, তা তো হতে পারে না। ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। মেয়েরাও খেলছে। ছেলেরা ফুটবল খেলছে। মেয়েরাও খেলছে। ছেলেরা ট্রেন চালাচ্ছে। মেয়েরাও ট্রেন চালাচ্ছে। এমনকি বাসও চালাচ্ছে মেয়েরা। মাংস বিক্রির কসাইও হয়েছেন একজন নারী। ছেলেদের মতো উবার চালাচ্ছেন মেয়েরা। তারা এত কিছু করতে পারলে ধূমপানে দোষ কী? ‘নেশা খাবি খা মারা যাবি যা’—এত কিছু জানার পরও যদি কেউ সর্বনাশা নেশার পথে পা বাড়ায় তাহলে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া তো কিছুই করার থাকে না। ছেলেরা ধূমপান করলে যদি শাস্তি না পায় তাহলে মেয়েরা একই অপরাধে শাস্তি পাবে কেন?

যতবারই এই প্রশ্নটি ভেবেছি ততবারই বিব্রত হয়েছি। আচ্ছা, ধরা যাক, কোনও পরিবারে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও প্রকাশ্যে ধূমপান করতে শুরু করলো। বাবা সিগারেট খান, ছেলেও সিগারেট খায়। মা সিগারেট খান, মেয়েও সিগারেট খায়। তাদের দেখাদেখি বাড়ির কাজের ছেলে-মেয়েরাও সিগারেট খায়। তাতে দোষের কী? কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? সমঅধিকারের কথা যদি বলি, তাহলে তো ঠিকই আছে। ছেলে যা করবে মেয়েরাও তা করার অধিকার রাখে। ছেলেরা এই অন্যায় করলে যদি দোষের কিছু না হয়, তাহলে মেয়েরা একই অন্যায় করলে দোষের হবে কেন?

তবে এটাতো তর্কের কথা। ছেলে-মেয়ের সমঅধিকার নিয়ে তর্ক হতেই পারে। কিন্তু সমাজ, সংস্কার বলে তো একটা কথা আছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই মেয়েরা ধূমপান করে। কাজেই বাংলাদেশে করলে দোষের কী? কিন্তু সমাজ বাস্তবতার কথা তো ভাবতে হবে। জাপানে বাবা-ছেলে একই সঙ্গে কাপড়বিহীন শরীরে গোসল করে। মা ও মেয়েও একইসঙ্গে গোসল করে। ওদের গণগোসলখানা আছে। যেখানে ছেলেরা কাপড় বিহীন শরীরে যৌথভাবে গোসল করে। মেয়েরাও তাই করে। এটাই তাদের সামাজিক রীতি। সংস্কৃতির অংশ। বাংলাদেশে কি তা সম্ভব? অনেকে হয়তো বলবেন কেন সম্ভব নয়। ওরা পারলে আমরা কেন পারবো না? কিন্তু জীবনের সব ক্ষেত্রেই কি আমরা এমন কথা বলতে পারি? ওরা কখনও মিথ্যা কথা বলে না, অন্যায় দুর্নীতি ও মিথ্যাকে কখনও প্রশ্রয় দেয় না। মেধাবীদের সম্মান করে। আমরা কি তা করি? ওরা যা করে আমরা যদি তাই করতে চাই তাহলে সবটাই অনুসরণ করতে হবে। ওদের মেয়েরা সিগারেট খায়। কাজেই আমাদের মেয়েদের সিগারেট খেতে দিতে হবে। মানছি সে কথা। কিন্তু ওদের মেয়েরা সামাজিকভাবে সব সময়ই নিরাপদ থাকে। রাত দুপুরেও একা রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে নিরাপত্তার ভয় থাকে না। আর আমাদের দেশে কখনও কখনও দিনের আলোতেও মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়। মেয়েদের অনেক দোষ। তাদের হাঁটার দোষ, চলাফেরায় দোষ। তাদের কথাবার্তায়ও দোষ।

অনেকে হয়তো ভাবছেন মেয়েদের ধূমপান করার ক্ষেত্রে আমি হয়তো বিরোধিতা করছি। মোটেও তা নয়। বরং আমি মনে করি ছেলেরা ধূমপান্ করতে পারলে মেয়েরা করতে পারবে না কেন? ‘নেশা খাবি খা, মারা যাবি যা’—এই রকম সত্যটা জেনেও কেউ যদি মৃত্যুর পথে পা বাড়ায় তার জন্য দুঃখ করা ছাড়া আর কীই বা করার আছে। তবে এখানে একটা কথা আছে। ওই যে বললাম, সমাজ সংস্কারের একটা ব্যাপার আছে। একটু আগেই যে কথা উল্লেখ করেছি। আমি ইচ্ছে করলেই যা খুশি তা করতে পারি না। ‘অমুকে’ এটা করেছে কাজেই ‘তমুক’ এটা করবে না কেন? তারও তো সেটা করার রাইট আছে। হ্যাঁ রাইট আছে। তাই বলে আমি এমন কিছুই করতে পারি না, যা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আবারও বলছি, আমি মেয়েদের ধূমপান করার বিপক্ষে নই। তারা যদি ছেলেদের মতোই এই অধিকারটি ভোগ করতে চায় তাতে দোষের কিছু দেখি না? তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে ধূমপান করা কি অধিকারের পর্যায়ে পড়ে? নিশ্চয়ই না। প্রকাশ্যে ধূমপান কোনও অধিকার নয়। আপনি প্রকাশ্যে যেখানে সেখানে ধূমপান্ করতে পারবেন না। নিয়ন্ত্রিত স্থানে অর্থাৎ নির্ধারিত জায়গায় আপনি ধূমপান করতে পারবেন। এই নিয়ম কি আমরা সবাই মানি? ছেলেরা তো মানেই না। ছেলেদের দেখাদেখি মেয়েরাও যেন ইদানীং এক্ষেত্রে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমে পড়েছে। কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় গিয়েছিলাম। যেন তারুণ্যের হাট বসেছে। যে দিকে তাকাই শুধুই মেধাবী তরুণ-তরুণীর মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। চা খাচ্ছে আড্ডা দিচ্ছে। অধিকাংশরাই মোবাইলফোনে ব্যস্ত। হঠাৎ একদল ছেলে-মেয়ের প্রতি আমার নজর পড়লো। তিনজন ছেলে দু’জন মেয়ে। টিএসসির দেয়ালের ওপর বসে পা নাচাচ্ছে আর চায়ের কাপের সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে। ছেলে ৩টির চেয়ে মেয়ে দুটি যেন অতিমাত্রায় অ্যাগ্রেসিভ। ডেমকেয়ার ভাব। বিশেষ স্টাইলে চা খাচ্ছে আর সিগারেট টানছে। পাশেই রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছে তারা দৃশ্যটি বেশ কৌতূহলের সঙ্গে হয়ে দেখছে। অনেকে বিরূপ মন্তব্য করে চলে যাচ্ছে। মন্তব্যের অধিকাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। মুদ্রণযোগ্য নয় এমন অনেক অশোভন মন্তব্যও করছিলেন অনেকে।

এই দৃশ্য দেখে অনেক প্রশ্নই মাথার ভেতরে ঘুরপাক করতে শুরু করলো। যারা প্রকাশ্যে ধূমপানরত মেয়েদের দেখে বিরূপ, অশোভন মন্তব্য করে চলে যাচ্ছে, তারা কি অন্যায় করছে? একবার মনে হলো অবশ্যই তারা অন্যায় করছে। প্রকাশ-অযোগ্য ভাষায় আপনি কারও সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার অধিকার রাখেন না। সঙ্গে সঙ্গে আবার একথাও মনে হলো, অশোভন, অসুন্দর আচরণের কি প্রতিবাদ হবে না?

প্রিয় পাঠক, আবারও বলছি সিগারেট খাওয়া-না খাওয়া নিয়ে আমি মোটেও শঙ্কিত নই। এত এত অধিকার সচেতন সময়েও কেউ যদি সিগারেটের মতো নেশা করে স্মার্টনেস শো করতে চায়, সে ক্ষেত্রে বলার কিছু নেই। আমি শঙ্কিত সামাজিক শিষ্টাচার নিয়ে। এই দেশে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্নেহ, বিশ্বাস ও ভালোবাসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত। তরুণদের কারও কারও ধারণা প্রবীণরা ব্যাকডেটেড। প্রবীণদের কারও কারও ধারণা, বর্তমান সময়ের তরুণ-তরুণীরা খুব বেশি অস্থির। কারও কারও কাছে তারা ‘বেয়াদব’। আকাশ সংস্কৃতির দোর্দণ্ডপ্রতাপে দেশে আদব-বেয়াদবের নেপথ্য লড়াই চলছে। কেউ কি আছেন, এই প্রবণতার ভবিষ্যৎ বলতে পারবেন?

(লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ