আজ বৃহস্পতিবার, ২রা এপ্রিল, ২০২০ ইং

টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না বিআরটিতে

  • আপডেট টাইম : February 17, 2020 10:49 AM

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) অফিসে দালাল ছাড়া হয় না কোনো কাজ। গুনতে হয় বাড়তি টাকা। দালাল মাধ্যমে ছাড়া কাজ করালে মাসের পর মাস ফাইল আটকে দেওয়া হয়। ঘুষ ছাড়া মোটরযান রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। জেলার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী আনফিট গাড়িকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়ে দেন এই অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা। সিলেট বিআরটিএ অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতিদিনই অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা।

মাঝে মধ্যে বিআরটিএ অফিসে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। এতে কিছুদিন দালাল চক্রের আসা যাওয়া বন্ধ হলেও বিআরটিএ অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের স্বার্থে এসব দালাল পুষে রাখেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে নানা হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষের। ফলে দিন দিন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েই চলছে সিলেট বিআরটিএ অফিসে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য লার্নার ফরম, লিখিত পরীক্ষা, ফিল্ড টেস্ট, বায়োমেট্রিক ছাপ, নবায়ন, গাড়ির ফিটনেস, রোড পারমিটসহ সব কাজ দালালের মাধ্যমে না করালে পদে পেদ ভোগান্তি পোহাতে হয় জনসাধারণের। স্বাভাবিক নিয়মে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে যেখানে তিনমাস লাগার কথা সেখানে এক বছর সময় লেগে যায়। মোটরসাইকেলের পেশাদার লাইসেন্স করতে ২ হাজার ও অপেশাদার এর জন্য ৩ হাজার টাকা ফি নির্ধারিত থাকলেও দালালরা নিচ্ছে ৬-৭ হাজার টাকা। ভোগান্তির কথা চিন্তা করে অনেকে দালালের মাধ্যমে করছে ড্রাইভিং লাইসেন্স। আবার কেউ কেউ ফিল্ডটেস্ট না দিয়ে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিনিময়ে পেয়ে যান লাইসেন্স। আঙ্গুলের ছাপ দিতেও লাগে বাড়তি টাকা; না হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়াতে হয় লাইনে। আবার টাকা দিলে মিলে যায় সিরিয়াল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে প্রথমে লার্নার হতে হয়। ৩ মাসের জন্য লার্নার হিসেবে গাড়ি চালানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। দুই মাস পরে পরীক্ষা নেওয়া হয় (লিখিত-১০, ভাইভা-২০, ফিল্ড টেস্ট-৭০)। পরীক্ষায় পাস করলে পুলিশ ভেরিফিকেশন, বায়োমেট্রিক ছাপসহ আনুসাঙ্গিক কাজে মোট সাড়ে ৩ মাসে লাইসেন্স পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো ৭ হাজার টাকার নিচে কোন লাইসেন্স করা যায় না। আর ৮মাস থেকে বছরের আগে লাইসেন্স পাওয়া যায় না।

ভুক্তভোগীরা জানান, লার্নার ফরম অফিস থেকে দেয়ার কথা থাকলেও সব সময় পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে কিনতে হয়। আবার সেই ফরম পূরণ করে জমা দিতেও সিরিয়াল ধরতে হয়। জমা দেয়ার সময়ও দিতে হয় টাকা। দালালদের ভাষায় সেটাকে বলা হয় ম্যানেজ ফী। এভাবে ৬০০ টাকার লার্নার লাইসেন্স নিতে প্রায় হাজার টাকা ব্যয় হয়। অভিযোগ আছে দালাল কিংবা নির্দিষ্ট মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা না দিলে ড্রাইভিং পরীক্ষার সিডিউল মিলে না, পরীক্ষায় ফেল রাখা, পুলিশ ভেরিফিকেশন, বায়োমেট্রিক ছাপ দিতে দীর্ঘ লাইনসহ নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। আবার কোন কিছু না পারলেও ১৬ হাজার টাকা দিলে স্বল্প সময়ে মিলে যায় ড্রাইভিং লাইসেন্স।

বিআরটিএ অফিসে আসা কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, বেশিরভাগই ভোগান্তির শিকার হয়ে দালাল দিয়ে কাজ করিয়েছেন। তাদেরই একজন জকিগঞ্জ থেকে আসা বারেক মিয়া। যিনি লার্নার পাওয়ার প্রায় ৮মাস পরে লিখিত পরীক্ষার তারিখ পেয়েছেন। তিনি জানান শুধু এই সিডিউল পাওয়ার জন্য তিনি অন্তত ১০ দিন এ অফিসে এসেছেন; অবশেষে দালাল ধরে ৫০০টাকার বিনিময়ে লিখিত পরীক্ষার সিডিউল পেয়েছেন।

দীর্ঘদিন থেকে গাড়ি ব্যবসা ও চালনার সাথে জড়িত কবির মিয়া বলেন, সিলেট বিআরটিএ ‘দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য’। এখানে টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না; স্বাক্ষরও মিলেনা।

সিলেট বিআরটিএ অফিসের সহকারী পরিচালক মো. সানাউল হক বলেন, আমার জানামতে কোনো দালালের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স হয় না। সিলেট বিআরটিএ দালালমুক্ত। আর অফিসের কোনো স্টাফ যদি দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকে তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে কথা হয় এক দালালের সঙ্গে তিনি বলেন, বিআরটিএ অফিসারদের বেঁধে দেয়া টাকা কম দিলে তারা ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। ফাইল আটকে রাখেন। প্রতিটা কাজে তারা আলাদা আলাদা রেট নির্ধারণ করে দেন।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ