আজ বৃহস্পতিবার, ২রা এপ্রিল, ২০২০ ইং

আরিফের বিরুদ্ধে অনাস্থায় স্বাক্ষর করেননি কয়েস লোদী

  • আপডেট টাইম : March 4, 2020 5:20 PM

বিশেষ প্রতিবেদক : আরিফুল হক চৌধুরী ও রেজাউল হাসান কয়েস লোদী দুজনেই বিএনপি নেতা। শুধু নেতা নন, দুজনেই বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান এম. সাইফুর রহমানের ঘনিষ্ট সহযোগী। একজন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আর অপরজন সাবেক প্যানেল মেয়র (১) ও কাউন্সিলর। দলীয় ভাবে দুজনের মধ্যে এই অমুল মিল থাকলেও মিল নেই নগর ভবন পরিচালনায়।

সিসিকের গত মেয়াদে প্যানেল মেয়র (১) সিলেট রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। এই মেয়াদে দীর্ঘ সময় মেয়র আরিফ জেলে থাকলেও একটি বারের জন্যও ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দেয়া হয়নি তাকে। এটি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছিল। আদালতও কয়েস লোদীকে মেয়রের দায়িত্ব দেয়ার নির্দেশ দিলেও শেষ পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি।

জনশ্রুতি রয়েছে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী কুটচাল করে কয়েস লোদীর প্যানেল মেয়রর পদের বিরুদ্ধে সিটি কর্পোরেশনের আইন বহির্ভূতভাবে মন্ত্রণালয়ে অনাস্থা প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু এত কিছুর পরও মেয়র আরিফের বিরুদ্ধে সিসিকের ৩৬ কাউন্সিলরের মধ্যে ২২ জন কাউন্সিলরের স্বাক্ষর করা অনাস্থা ও অপরাসনের চিঠিতে স্বাক্ষর নেই কয়েস লোদী।

এই নগর ভবনের কর্তৃত্ব নিয়ে দুজনের সম্পর্কের মধ্যে এত ফাটল ধরলেও কি কারনে মেয়রের বিরোদ্ধে দেয়া চিঠিতে কয়েস লোদীর স্বাক্ষর নেই এনিয়ে নগরবাসীর মনে দেখা দিয়েছে না না জল্পনা কল্পনা। তাকে একটি বারের জন্যও মেয়রের দায়িত্ব নিতে দেন নি যে আরিফুল হক চৌধুরী তার বিরোদ্ধে এত বড় অভিযোগ পেয়েও কেন সুযোগ কাজে লাগান নি কয়েস লোদী?

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রেজাউল হাসান কয়েস লোদী আজকের সিলেটকে বলেন, আমি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাষী নই। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী আমার বসায় গিয়েছিলেন। আমার মায়ের সাথে দেখা করেছিলেন। আমার মা আমাকে বলেছেন যা হয়েছে সবকিছু ভুলে যেতে। ভুল তো মানুষ মাত্রই হয়, আমিও যা হয়েছে ভুলে গেছি।

প্রসঙ্গত, বুধবার সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর অপসারণ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিচ্ছেন ২২ জন কাউন্সিলর । অনিয়মের অভিযোগ এনে সিসিকের ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ট কাউন্সিলররা অপসারণ পত্রে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্র সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবেন।

মেয়র অপসারণ চাওয়া অভিযোগে স্বাক্ষর করেন- সিটি করপোরেশনের ১০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. তারেক উদ্দিন তাজ, ৩র্ন ওয়ার্ডের এ কে এম লায়েক, ২০ নং ওয়ার্ডের আজাদুর রহমান আজাদ, ১৩ নং ওয়ার্ডের শান্তনু দত্ত শন্তু, ২৫ নং ওয়ার্ডের তাকবিরুল ইসলাম পিন্টু, ১৪ নং ওয়ার্ডের নজরুল ইসলাম মুনিম, ১৬ নং ওয়ার্ডের আব্দুল মুহিত জাবেদ, ১নং ওয়ার্ডের সৈয়দ তৌহিদুল হাদী, ২১ নং ওয়ার্ডের আব্দুরন রকিব তুহিন, ১৫ নং ওয়ার্ডের ছয়ফুল আমিন বাকের, ৬ নং ওয়ার্ডের ফরহাদ চৌধুরী শামীম, ২৩ নং ওয়ার্ডের মোস্তাক আহমদ, ৯ নং ওয়ার্ডের মখলিছুর রহমান কামরান, ১৯ নং ওয়ার্ডের এসএম শওকত আমিন তৌহিদ, ৮ নং ওয়ার্ডের ইলিয়াছুর রহমান, ১১ নং ওয়ার্ডের রকিবুল ইসলাম ঝলক, ১২ নং ওয়ার্ডের সিকন্দর আলী, সংরক্ষিত-৪ নং ওয়ার্ডের মাসুদা সুলতানা, সংরক্ষিত-৭ নং ওয়ার্ডের নাজনীন আক্তার কনা, সংরক্ষিত-৮ নং ওয়ার্ডের রেবেকা আক্তার লাকি।

লিখিত অভিযোগে কাউন্সিলররা উল্লেখ করেছেন- বাংলাদেশ সরকার যখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহীত, সবার অংশগ্রহণে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করার নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তখনই লক্ষ্য করা গেছে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সাধারণ সভায় উপস্থাপন ও আলোচনা না করে বর্তমান পরিষদকে উপেক্ষা করে পরিষদের সিদ্ধান্ত ছাড়াই দক্ষিণ সুরমা এলাকার তেঁতলী ইউনিয়নের বানেশ্বরপুর মৌজায় জায়গা অধিগ্রহণ করেছেন।

তাছাড়া সিটি করপোরেশনের জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে টাকার বিনিময়ে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিভিন্ন শাখায় লোক নিয়োগ করেছেন। তার ব্যক্তিগত বৃহৎ স্বার্থে সিটি করপোরেশনের স্বার্থ ক্ষুদ্র করে কাজে আসে না এমন অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। বিভিন্ন এলাকায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিল পাওয়ার ক্ষেত্রে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য করেন, যা সিটি করপোরেশনের আইন ও বিধিমালার ধারা-১৩ এর উপধারা ১ (ঘ) অনুসারে মেয়র পদে থেকে অপসারণ যোগ্য অপরাধ। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বিষয়টি তদন্ত পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক। বিষয়টি বিবেচনা পূর্বক তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ কর্তৃপক্ষ মেয়রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান তারা।

কাউন্সিলররা আরো জানান, গত দু’দিন আগে মেয়র অপসারণের বিষয়ে একমতে পৌছতে তারা বেশ কয়েকবার বৈঠকে মিলিত হন। অনেকটা গোপনে বৈঠকে মিলিত হয়ে ঐক্যমতের পর এবার প্রকাশ্যে আসছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্চুক অভিযোগকারী কাউন্সিলরদের অনেকে বলেন, আপাতত আমরা অভিযোগ দিচ্ছি। পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলন করে মেয়রের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয় তুলে ধরবো।

অভিযোগে স্বাক্ষরকারী সিসিকের কাউন্সিলররা জানান, পরিষদকে না জানিয়ে তেঁতলী ইউনিয়নের বানেশ্বপুর মৌজায় ২৭ কেদার (৪১০ শতক) ২০ শতক ভূমি ২৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা অধিগ্রহণ ব্যয় দেখিয়েছেন মেয়র। কিন্তু তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন ওই টাকায় ৩ ভাগের একভাগ টাকা দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। এছাড়া ৫০ জনের স্থলে আড়াইশ’ পরিচ্ছন্ন কর্মীর বেতন তুলে আত্মসাত করা হচ্ছে।

এসব অভিযোগের বাইরেও মেয়র নিজের মেয়েকে সিসিকের একটি প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে রেখেছেন মোটা অংকের বিনিময়ে। আর ডে লেবারদের এপিএস, পিএস করে বিদেশে পাঠিয়েছেন, বলেও অভিযোগ করেন তারা।

তারা বলেন, এই অভিযোগ বুধবার দুপুরে সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হবে। এছাড়া আরো বিস্তর অভিযোগ আছে মেয়রের বিরুদ্ধে, যেগুলো তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেন অভিযোগকারী কাউন্সিলররা।

কাউন্সিলরদের পক্ষে সিসিকের ২৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৌফিক বকস লিপন স্বাক্ষরিত অভিযোগের অনুলিপি প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও মেয়রের একান্ত সচিব বরাবরে দেওয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ