আজ বুধবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেন নিজেই রোগী!

  • আপডেট টাইম : সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৭ ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : ‘হাসপাতালে ভর্তি আছিলাম। একবার ডাক্তার আইয়া দেখলো না। কোনো ওষুধও পাইলাম না। অতারলাগি (এরজন্য) সিট ছাড়িয়া যাইয়ার গি (চলে যাচ্ছি)।’ স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে কথাগুলো বলছিলেন রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিমভাগ গ্রামের আব্দুল মুমিন।

তিনি জানান স্ত্রীর প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কোনো রকম স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে ক্ষোভে দু:খে হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্যসেবার এই বেহাল দশা মৌলভীবাজার জেলা সদরের রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

হাসপাতালে সেবা নিতে আসা লোকজন জানান, জেলা সদরের কাছাকাছি হওয়ায় সবাই প্রথমে এই হাসপাতালে আসে। কিন্তু কাটা ছেড়া, কিংবা দুর্ঘটনার রোগী হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার আগেই রেফার্ড করা হয় জেলা সদর হাসপাতালে। আর জটিল কিংবা মারাত্মক দুর্ঘটনা হলে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে। সেবা নিতে আসা সাধারণ রোগিদের প্রশ্ন তাহলে সরকারি বরাদ্ধকৃত ওষুধগুলো যায় কোথায়?

সরেজমিনে হাসপাতালে গেলে চোখে পড়ে আরও করুণ দৃশ্য। হাসপাতালে প্রবেশ করলেই প্রথমে মনে হবে, হাসপাতালতো নয় -এটা কোনো ভূতেড় বাড়ি। শেওলা আর ময়লার এক উদ্ভট দুর্গন্ধ প্রথমে স্বাগত জানায়। মেইন গেইট ধরে ভেতরে প্রবেশ করতে চোখে পড়ে কুকুরের নিরাপদ ঘুমের দৃশ্য। প্রবেশ পথের এই দৈন্যদশা ভেতরের ভয়াবহ চিত্রের যেন একটা আগাম বার্তা।

রাজনগর উপজেলার প্রায় আড়াই লাখ মানুষের জন্য নির্মিত এই ৩১ শয্যা হাসপাতালটির পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডের করুণ চিত্র। গন্ধে সেখানে অবস্থান করাটাই মুশকিল। এরমধ্যেও গরিব অসহায় মানুষ ভর্তি হন স্বাস্থ্য সেবা পাবার আসায়। হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগিদের সবাই জ্বর, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া আক্রান্ত। পুরুষ ওয়ার্ডের বারান্দায় ভাঙা সিট, পরিত্যক্ত ফোম আর বেড শিট মিলে গোটা বারান্দা জানান দিচ্ছে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের থেকে শুরু বড়কর্তার কাজ শুধু চাকরি করা আর কোনো মতে মাস শেষ হলে বেতন উত্তোলন। এটাই যেন তাদের লক্ষ ও উদ্দেশ্য।

হাসপাতাল ঘুরে কোনো ডাক্তারের দেখা না পেয়ে অবশেষে দ্বারস্থ হতে হয় হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তার কাছে। গিয়ে দেখা গেল তিনিও মহাব্যস্ত। যেন একটু কথা বলারও সময় নেই। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর পরিচয় দিয়ে হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি একটু চিন্তায় পড়ে যান।

অবশেষে নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সভায় আছেন। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ছুটিতে। হাসপাতালের ১০ ডাক্তারের বিপরীতে দুইজন ডাক্তার কর্মরত আছেন।

পরিসংখ্যান কর্মকর্তার সাথে কথার ফাঁকে মিটিং থেকে ফিরে আসেন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. উত্তম কুমার শর্মা। তিনি জানান, ১০টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে ৪টি-ই শূন্য। কর্মরত আছেন ৬ জন। এরমধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বর্নালী দাস রয়েছেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। ডা. শুভাশীষ গুপ্ত পারিবারিক ছুটিতে। ডা. শামসুন্নাহার ইভা প্রেষণে আছেন হবিগঞ্জ সদরে।

ডা. উত্তম কুমার শর্মা আরও জানান, হাসপাতালে ডাক্তার সঙ্কট অনেক আগে থেকেই। এটা সবারই জানা। এই সঙ্কট নিয়েও আমরা মানুষকে সাধ্যমত সেবা দিয়ে যাচ্ছি। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে হাসপাতাল ভবন নিয়ে। কেননা বর্তমানে জরাজীর্ণ এই ভবনে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করাটাই দুষ্কর ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।

এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী ডাক্তার সংকটের কথা স্বীকার করে জানান, এখানে মোট কর্মরত চারজন ডাক্তার আছেন। তারমধ্যে দু’জন ট্রেনিংয়ে, পুরাতন ভবনটি ৫০ শয্যায় রুপান্তরিত হবে বলে এখানে মেরামতের জন্য কোনো বরাদ্ধ আসছে না, তবুও সংস্কার কাজের জন্য ২০ লাখ টাকা অনুদান চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন অনুদান আসলে কাজ শুরু হবে। ডাক্তার রোগী না দেখার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছেন বলেও জানা তিনি।

 

(আজকের সিলেট/১৮ সেপ্টেম্বর/ডি/এমকে/ঘ.)

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ...