আজ শনিবার, ৫ই জুন, ২০২০ ইং

লন্ডনে যাপিত জীবন : পিয়ার ট্রি লেন

  • আপডেট টাইম : April 1, 2020 6:43 PM

সাঈদ চৌধুরী : লন্ডন এসেছি ২০০০ সালের ২৬ জানুয়ারী। এখানে আমার প্রথম ঠিকানা ছিল ইস্ট লন্ডনের পিয়ার ট্রি লেন। শ্যাডওয়েল বেসিনের পার্শ্ববর্তী সুবিশাল লেক সংলগ্ন বাসা। বৃহদাকার বাউন্ডারি সমৃদ্ধ। চমৎকার নৈসর্গিক পরিবেশ। বাসার নীচ তলায় বৈঠকখানা। দু’তলায় থাকেন আমার শশুর। আমি ৩য় তলায়। ঘরে বসে মনে হত সমুদ্রবর্তী কোথাও অবস্থান করছি।

আমার শশুর আবু বকর চৌধুরী একজন সংস্কৃতিবান মানুষ। সুনামগঞ্জ দরগাপাশার পুরাতন জমিদার পরিবারের সদস্য। সিলেট শহরের কুমারপাড়ায় স্থায়ী বসবাস। বিলেত এসেছেন স্বাধীনতার আগে। এখানকার বাঙ্গালি কমিউনিটির সমৃদ্ধির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। ফলে বাড়ি কেনার পূর্ব পর্যন্ত কোন ভাড়া বাসায় আমাকে যেতে দেননি। একসাথে থাকতে বাধ্য করেছেন। আমার সহধর্মিনী পেশায় একাউন্টেন্ট। তার একান্ত প্রয়াসে ২০০৩ সালে আমরা নিজস্ব বাসায় চলে আসি।

পিয়ার ট্রি লেনে থাকাবস্থায় বাসার ঠিক সামনে শ্যাডওয়েল বেসিনের সবুজ মাঠে প্রতিদিন ব্যায়াম ও পায়চারি করতাম। রোদেলা দিন হলে মাঠের শেষ প্রান্তে টেমস নদীর তীরে বসে সাহিত্য রচনা করতাম। যে স্থানটিতে বসে আমি লেখি, সেটিও এক ঐতিহাসিক জায়গা। ম্যাড্জ ডার্বি (Madge Darby) তার ঐতিহাসিক গ্রন্থ ওয়্যাপা’স পিপল্স (Waeppa’s People) লিখেছিলেন ঠিক এই জায়গায় বসে। আমার অনেকগুলো ভালো কবিতা টেমস তীরে এই নান্দনিক পরিবেশে লেখা হয়েছে।

শ্যাডওয়েল বেসিন ঘনিষ্ঠভাবে ওয়াপিংয়ের সাথে এবং বৃহত্তর অর্থে লন্ডনের ইতিহাসের সাথে আবদ্ধ। জো স্পেন্সার তার ব্রিফ হিস্ট্রি অফ ওয়াপিং গ্রন্থে (Zoe Spencer’s Brief History of Wapping) লিখেছেন, ওয়াপিং মূলত একটি স্যাকসন বন্দোবস্ত ছিল। এটি ছিল টেমস নদীর পার্শ্ববর্তী একটি জলাশয়। ওয়াপল অর্থ বুদবুদ বা ফেনা (‘wapol’ meaning ‘bubble’)। এর থেকেই ওয়াপিং নামকরণ হয়েছে। ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত এটি বাগান সমৃদ্ধ নৌঘাট ছিল। ওয়াপিংয়ে সমুদ্র সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৫৪৬ সালে লাইমহাউস থেকে যাত্রা করার আগে স্যার ওয়াল্টার রেলিহের (Sir Walter Raleigh) জাহাজটি ওয়াপিংয়ে সজ্জিত হয়েছিল। তরুণ জেমস কুক ওয়াপিংয়ের বাসিন্দা ছিলেন। ক্যাপ্টেন ব্লাইও ওয়াপিংয়ে বহু বছর বসবাস করেছেন।

নদী পথে মালামাল পরিবহনের ঘাট হিসেবে এটি ব্যবহৃত হত। আমার জন্মভূমি সিলেট সদর উপজেলার বাদঘাট এর সাথে একটা অদ্ভুত মিল আমি খুঁজে পাই। ভারত থেকে নদীপথে সিঙ্গেরখাল নদী দিয়ে মালবাহী স্টিমার এসে বাদাঘাট এলাকায় থামত। আর এখানে এশীয় অঞ্চল থেকে চাল, তামাক ইত্যাদি পণ্য নিয়ে লন্ডনে আগত জাহাজগুলী আনডাউন হয়। কেন জানি ইতিহাসের চোরাবালিতে আমাদের জাহাজি শ্রমিকদের ছোঁয়া আমি অনুভব করি।

প্রায় ৪০০ বছর ধরে টাওয়ার হ্যামলেটসে বাঙালির বসবাস। জাহাজের নাবিক কিংবা শ্রমিক হিসেবে তারা প্রথম এসেছিলেন। বিভিন্ন দেশ হয়ে এক সময় ইস্ট ইন্ডিয়া ডক কোম্পানিতে কাজ নিয়ে এসে ওঠেন পূর্ব লন্ডনের ওয়াপিং ও শ্যাডওয়েল এলাকায়। এদের মাধ্যমেই টাওয়ার হ্যামলেটসে বাঙালির বসতি শুরু। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে ভাওচার ভিসায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ব্রিটেনে আসা শুরু হয়। তবে সীমিত সংখ্যক হলেও উচ্চ শিক্ষার জন্যও এসেছেন কেউ কেউ।

শ্রমিক ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা আন্দোনের সূতিকাগার ছিল এই এলাকা। ১৬৬৬ সালে নাবিক ও শ্রমিকদের স্বল্প বেতনের বিরুদ্ধে ডিউক অব অ্যালবামার (Duke of Albemarle) নিরাপত্তা কর্মিদের সাথে ভয়াবহ দাঙ্গার ঘটনা এখানেই ঘটেছে। ১৮০০ সালে ডক আইন (London Dock Act) পাস হয় এবং এখানে লন্ডন ডক স্থাপিত হয়। তখন দরিদ্র জনগনকে ন্যূনতম মূল্য দিয়ে বিনা ক্ষতিপূরণে তাড়িয়ে দেয়া হয়। আজকের এই অভিজাত ভবন সমূহের নিচে চাপা পড়ে আছে অনেক গরীব মানুষের বাড়িঘর ও ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ভাবতে কষ্ট হয়!

সে যাক, একসময় ওয়াপিংয়ে নৌবাহিনীর সৈনিকদের বসবাস ছিল। এখান থেকেই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হত। নদীপথে নাবিকদের সাথে প্রায়ই জলদস্যুদের রক্তাক্ত লড়াই সংঘটিত হয়। নিরাপত্তার জন্য চোর-ডাকাত প্রতিরোধে তখন প্রতিবছর ব্যয় ছিল প্রায় অর্ধ মিলিয়ন পাউন্ড। দণ্ডপ্রাপ্ত বিদ্রোহী ও জলদস্যুদের সাউথওয়ার্কের মার্শালিয়া জেলখানা থেকে ওয়াপিংয়ে এক্সিকিউশন ডকে নিয়ে আসা হয়। এখানে তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। তাদের দেহগুলি তখন খাঁচায় ফেলে রাখা হয়।

১৭৯৮ সালে লন্ডনে নদী পুলিশ বাহিনী (River Police Force) প্রতিষ্ঠা করা হয়। থেমস পুলিশ সদর দফতরটি (Thames Police Headquarters) আজও ওয়াপিংয়ে অবস্থিত। বিভিন্ন দেশ থেকে ট্রেনিংয়ে আশা চৌকস পুলিশ অফিসারগন এখানে এসে অভিজ্ঞতা নিয়ে যান।

শ্যাডওয়েল বেসিনের উভয় প্রান্তে স্টিলের সেতুগুলি বেশ চমৎকার। ব্রিজগুলি ওয়াপিংয়ের ভিতর এবং বাইরে অ্যাক্সেসের একমাত্র মাধ্যম। শ্যাডওয়েল বেসিনটি ওয়াপিং ডকগুলির সর্বশেষ স্থাপনা। ডার্টমুর কারাগারের (Dartmoor Prison) স্থপতি ড্যানিয়েল আলেকজান্ডার (Daniel Alexander) লন্ডন ডক ডিজাইন করেছিলেন। তার ক্লাসিকাল নকশা এখনো প্রশংসিত। এখানে হাউজবোট এবং লিভ-ইন ইয়টও পাওয়া যায়।

শ্যাডওয়েল অঞ্চল উন্নয়নের প্রাণপুরুষ টমাস নেল (Thomas Neale) ১৬৫৬ সালে শ্যাডওয়েল বেসিনের সেন্ট পলস চ্যাপেলটি তৈরি করেছিলেন। এটি ১৮২১ সালে পুন:নির্মাণ করা হয়। এখানকার প্রায় আবাসস্থল ছোট কাঠের ফ্রেমে ইট দিয়ে পূর্ণ ছিল। পেলিকান সিঁড়ির দিকে যাওয়ার জন্য একটি ছোট্ট এলি রয়েছে। যখন নদীর জোয়ার কম হয় তখন নীচের দিকে যাওয়া যায়। হাইওয়ে এবং নদীর মধ্যবর্তী এ জায়গাটি ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনের অন্যতম সংযোগস্থল।

১৯৮৬ সালে রূপার্ট মারডোকের নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (Rupert Murdoch’s News International) এর মুদ্রণ কাজ এখান থেকে শুরু হয়। অবশ্য ২০০৮ সালে নিউজ ইন্টারন্যাশনাল এর প্রিন্টিং অপারেশন হার্টফোর্ডশায়ার চেশান্টে স্থানান্তরিত হয়েছে।

শ্যাডওয়েল বেসিনের সাথে ভাল পরিবহণ সুবিধা রয়েছে। ওয়াপিং ওভারগ্রাউন্ড স্টেশন এবং শ্যাডওয়েল ডিএলআর ও শ্যাডওয়েল আন্ডারগ্রাউন্ড সহজে ইস্ট লন্ডন এবং সাউথ লন্ডনের সাথে সংযুক্ত। এছাড়া নিকটবর্তী টাওয়ার হিল আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন থেকে ডিস্ট্রিক এবং সার্কেল উভয় লাইন যাতায়াত করে।

বর্তমানে এই এলাকায় বাংলাদেশী সহ বহু জাতিক মানুষ বাস করেন। শ্যাডওয়েল বেসিন আউটডোর একটিভিটিজ সেন্টার এখানে বেশ সক্রিয়। তারা দক্ষতার সাথে জল ভিত্তিক দুঃসাহসিক ক্রিয়াকলাপ পরিচালনা করে। সুযোগ সুবিধা এবং সরঞ্জামের ব্যবহার সাশ্রয়ী রাখতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সমস্ত ক্রিয়াকলাপ জাতীয়ভাবে স্বীকৃত যোগ্যতর কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। কেন্দ্রটি আরওয়াইএ এবং বিসিইউ দ্বারা অনুমোদিত শিক্ষণ কেন্দ্র হিসাবে স্বীকৃত। অ্যাডভেঞ্চার ক্রিয়াকলাপ লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত।

লন্ডনে যাপিত জীবনের প্রথম ঠিকানা পিয়ার ট্রি লেন। এটি লন্ডনের সমস্ত নদীর তীরবর্তী একটি জায়গা। ওয়াপিং চেলসির বিলাসবহুল বাঁধ, লন্ডন ব্রিজের চকচকে টাওয়ার এবং সাউথ ব্যাংকের সাংস্কৃতিক হাব বেষ্ঠিত অঞ্চল। স্মৃতির ডায়েরিতে এখানকার বহু গল্প লিপিবদ্ধ রয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ