আজ বুধবার, ১২ই আগস্ট, ২০২০ ইং

‘মানবেতর জীবন’ পার করছেন খেটে খাওয়া ‘কর্মহীন মানুষ’

  • আপডেট টাইম : July 16, 2020 10:30 AM

আহমাদ সেলিম (অতিথি প্রতিবেদক) : করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে সব ক্ষেত্রে। চাকুরী হারিয়ে কর্মহীন হয়েছেন বহু মানুষ। তার মধ্যে সবচেয়ে করুণ এবং দুর্বিসহ সময় পার করছেন হতদরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষজন। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে দু:সহ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কঠিন এ সময় সরকারের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সবাইকে তাদের পাশে দাড়াতে হবে বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষক, শিক্ষকসহ সচেতন মানুষ।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল ষ্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. জায়েদা শারমিন সাথী জানান, করোনার সময় অনেক বেসরকারি স্কুল কলেজের শিক্ষকদের চাকুরী চলে গেছে। শিক্ষকসমাজ ছাড়াও সিলেটে পরিচিত অনেক প্রতিষ্ঠানে মানুষ চাকুরীহারা হয়েছে, যা আমি নিজেও দেখেছি। যে মানুষগুলোর আয়ে সংসার চলতো সেই মানুষজন যদি কর্মহীন হয়ে পড়েন তাহলে সেই সংসারের অবস্থা ভালো হতে পারেনা।

করোনা ভাইরাস আসার পর থেকে সারা দেশের মতো ভালো নেই সিলেটের দিন আনে দিন খায় মানুষ। চরম দু:সময় পার করছেন তারা। কাজ কর্ম না থাকায় পরিবারের মুখে কিছু তুলে দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। বন্দরবাজার চুড়িপট্টির কাছে দেখা হয় বেশ কয়েকজন দিন মজুরের সাথে। তারা প্রতিদিন সকালে নগরীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে জড়ো হয়ে বসেন কাজের সন্ধানে।

আসলাম, জলিল, আনহার, শরিফ নামে কয়েকজন শ্রমিক জানান, ‘আমরা সব ধরণের কাজ করি। এখান থেকে আমাদের বিভিন্ন কাজের জন্য মানুষজন এসে তাদের বাড়িতে কিংবা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। কিন্তু করোনা আসার পর থেকে আমরা অসহায় হয়ে গেছি। আমরা আসি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, কিন্তু আমাদের কেউ ডাকে না। করোনার ভয়ে আমাদেরকে কেউ বাসাবাড়িতে নিতে চায়না।

কিছুদূর যাবার পর জেলরোড মুড়ে দেখা হয় জলিল মিয়া, খালিছ মিয়া নামে দুই শ্রমিকের সাথে। তারা পেশায় রাজমিস্ত্রী সহকারি। প্রতিদিনের মতো ওইদিনও কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়েছেন।

জলিল বলেন, ‘কাজ নেই চার মাস ধরে। বউ অন্যের বাসায় কাজ করতো। করোনা আসার পর তারও চাকুরী চলে গেছে। এখন দুই সন্তান নিয়ে দিনকাটছে অর্ধাহারে অনাহারে।’

করোনা ভাইরাস দেখা দেবার পর আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে খেটে খাওয়া এমন দু:খি মানুষের বহু গল্প। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে চরম এক দু:সময় পার করছেন। যা শুনলে অনেক সময় পাথর চোখেও পানি চলে আসে। এমনই একজন তাহের। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই।

ক্বীনব্রীীজের নিচে কথা হলে তিনি জানান, ‘আগে একটি কমিউনিটি সেন্টারে কাজ করতাম। করোনা ভাইরাস আসার পর বন্ধ হয়ে যায় সেন্টার। আমিও চাকুরীহারা হই। বাসায় তিন সন্তান। তাদের কথা চিন্তা করে ভাড়া নিলাম রিকসা। কিন্তু রিকসা নিয়েও ভালো নেই। সারাদিন বসে বসে সময় পার করি। করোনা ভাইরাসের ভয়ে মানুষ রিকসায়ও উঠেনা। এখন কোথায় যাবো, কি করবো বুঝে উঠতে পারছিনা।’

এনামুল হক (৩৪)। বাসা দক্ষিণ সুরমার ঝালোপাড়া এলাকায়। একটি সাউন্ড সিস্টেমের দোকানে কাজ করতেন। করোনার পর সেই দোকান বন্ধ। কারণ স্পিকার কিংবা মাইক কেউ ভাড়া নিচ্ছে না। তারপর থেকে তিনিও বেকার। করোনা সংক্রমণের ভয়ে নতুন কোনো দোকানে চাকুরীও পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় স্ত্রী, সন্তান নিয়ে পড়েছেন বেকায়দায়। তার মধ্যে মাস শেষে আছে বাসাভাড়া। এনামুলের সাথে থাকা কামরুলেরও একই অবস্থা। তিনি রেলস্টেশনে বসে ফলমুল বিক্রি করতেন। কিন্তু কয়েকমাস ধরে তিনিও বেকায়দায়। এখন আগের মতো নেই ট্রেন, নেই যাত্রী। সকাল সন্ধ্যা মানুষের আনাগোনা না থাকায় বেচাকেনাও নেই।

কামরুল বলেন, ‘স্টেশন এলাকায় আগের মতো যাত্রী নেই। যারা আসেন তাদের অনেকে করোনা সংক্রমনের ভয়ে বাইরের কিছু খেতে নারাজ। এ অবস্থায় আমাদের মাথায় হাত।’

খেটে খাওয়া এই মানুষগুলোর দাবি তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে সরকার যেন অন্তত দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করেন। অন্যথায় তাদেরকে না খেয়ে থাকতে হবে। তাদের সন্তান, মা বাবার মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। যাদের সাথে দেখা হলো, কথা হলো শুধু তারা নয়, আরো অনেক দিনমজুর, খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষ আছেন যারা একদিন কাজ না করলে পেটে ভাত যায় না, পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় তাদের। সেই মানুষজনও করোনার সময় কর্মহীন হয়ে দিশেহারা। তারাও চেয়ে আছেন মানুষের দিকে, সরকারের দিকে।

বিশিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তা এ কে এম আতাউল করিম জানান, ‘একটি প্রতিষ্টানের সাথে অনেকগুলো মানুষের সম্পর্ক। সিলেটে করোনা আসার পর খেটে খাওয়া মানুষ বেশী নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। করোন সংক্রমণের ভয়ে অনেকে তাদেরকে কোনো কাজের জন্য ডাকছেন না। তাদের পাশে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে দাড়াতে হবে। নতুবা এই মানুষগুলো কোথায় যাবে’।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী জানান, ‘অর্থনৈতিকভাবে সচল না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘুরে দাড়াতে পারবো না। সরকারও গরিব অসহায় মানুষের জন্য নানাভাবে সহযোগিতা করলেও অধিকাংশ স্থানে সেগুলো লুটপাট হয়ে যায়। তবে মানুষের এ দু:সময়ে প্রতিটি এলাকার জনপ্রতিনিধিরা বড় ভুমিকা রাখতে পারেন। এজন্য মানুষও তাদেরকে চিরদিন মনে রাখবে।’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল ষ্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. জায়েদা শারমিন সাথী আরো বলেন, ‘সরকার গরিব অসহায় মানুষের জন্য অনেক কিছু করছে। সেই সুবিধা তাদের কাছে যথাযথভাবে পৌছায় কি না সেটি একটি বিষয়। তবে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নমুখী সংগঠন কিংবা ব্যক্তিরা এগিয়ে আসতে পারেন। কর্মহীন মানুষ যাতে ঘরে বসেও আয় করতে পারে সেই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে।’

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলের, ‘বিষয়টি আমাদের মাথায় আছে। আমরা এসকল মানুষের জন্য ভাবছি। ঈদের আগে তাদেরকে কিছু দেয়ার পরিকল্পনা আছে।’

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ