আজ বৃহস্পতিবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের পটভূমি

  • আপডেট টাইম : August 24, 2020 8:14 AM

ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া : ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইন্শা আল্লাহ’। ইনশাআল্লাহ অর্থ যদি আল্লাহ চান। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব, যা আল্লাহ কুরআনে শিখিয়েছেন। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন (অর্থ) ‘তোমরা ইচ্ছা করবে না (তোমাদের ইচ্ছা বাস্তবে রূপ নিবে না) যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।’ সূরা তাকভীর : ২৯। সূরা কাহাফের ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে ‘ইনশাআল্লাহ’ এই আয়াত নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট অনেকেরই জানা আছে।

১৯০৫ সালে তদানীন্তন পূর্ববাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ)কে স্বতন্ত্র প্রদেশের মর্যাদা দেয়া হয়। নতুন প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল মুসলমান। ঢাকা হয় তার রাজধানী। এরই মধ্যে ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে ‘লাহোর প্রস্তাব’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এ অধিবেশনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকাগুলো নিয়ে একাধিক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে একটি ও পশ্চিমাঞ্চলে আরেকটি রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। পরবর্তীতে লাহোর প্রস্তাবই ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ বলে খ্যাতি লাভ করে। এ প্রস্তাব অনুসারেই ভারতবর্ষে পাকিস্তান আন্দোলন গর্জে উঠে।

নির্বাচনোত্তর মুসলিম লীগের দিল্লী সম্মেলনে বাংলাদেশেরই আরেক কৃতী সন্তান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একাধিক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাবটিকে সংশোধন করে এক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেন। তার প্রস্তাব তখন গৃহীত হয়। ফলে ১৯৪৭ সালে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়। সেদিন ধর্মের হিসাবেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে যায় তা না হলে হয়ত আমাদেরকে ভারত এর সাথে যেতে হত।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠা করা? এই প্রশ্নেই সারবত্তা বিশ্লেষণমূলক উত্তর পেতে হলে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেক্ষাপট ও চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্মেলনে প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক জনাব শামসুল হক ‘মূল দাবি’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা পাঠ করেন। এতে সুস্পষ্ট করে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আল্লাহর প্রতিভূ হিসেবে জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকবে। গঠনতন্ত্র হবে নীতিতে ইসলামী, গণতান্ত্রিক ও আকারে রিপাবলিকান।’ (বদরুদ্দীন ওমর, ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, পৃ. ২৪১)।

তাদের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের ১নং ধারায় ‘দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন শক্তিশালী করার’ কথা বলা হয়। গঠনতন্ত্রের ১০নং ধারায় বলা হয় :
‘To disseminate true knowledge of Islam and its high morals and religious principles among the people.’ অর্থাৎ জনগণের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান, তার উচ্চ নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় নীতিমালার বিস্তার করা।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট (যার প্রধান শরীক দল ছিল আওয়ামী লীগ এবং অন্যতম শরীক দল ছিল নেজামে ইসলাম পার্টি) নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে।

যুক্তফ্রন্ট-এর ২১ দফা কর্মসূচির মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়: ‘কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক নীতির খেলাফ কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না এবং ইসলামী সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে নাগরিকদের জীবন ধারণের ব্যবস্থা করা হবে।’ (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র, ১ম খ-, ৩৭০ পৃ)।

১৯৬৬ সালে তদানিন্তন আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা পেশ করেন। পরবর্তীতে এই ৬ দফাই বাংলাদেশ আন্দোলনকে বেগবান করে। সে ৬ দফা ছিল কতিপয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবি। এতে কোনো ধর্মনিরপেক্ষতার কথা ছিল না। বরং ১ম দফাটি ছিল লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি। ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনে ছাত্রসমাজের ১১ দফা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১১ দফায় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ কথা কোথাও বলা হয়নি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ঘোষণা দেয়া হয়। যে, ‘কুরআন সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস করা হবে না।’ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করার পর সংবিধান কমিটি (ড. কামাল হোসেন যার চেয়ারম্যান ছিলেন) কর্তৃক প্রণীত খসড়া সংবিধানের প্রস্তাবনায় তদানীন্তন ‘পাকিস্তানের মুসলমানদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে কুরআন সুন্নাহর আলোকে গড়ে তোলার’ কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র, ২য় খ-, সংযোজন১, পৃ. ৭৯৩)।

আওয়ামীলীগের জন্ম থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জনগণের সামনে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের কোনো প্রস্তাব বা কর্মসূচি পেশ করা হয়নি। বরং বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন ভাষায় জনগণকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কুশাসন ও আঞ্চলিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টকে, ১৯৭০ সালে আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তির আশায়, আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের প্রত্যাশায়। জনগণ কোনোক্রমেই ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যে ভোট দেয়নি। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে ভোটও চাওয়া হয়নি বরং বিপরীত কথাই বলা হয়েছে। কাজেই আমরা স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমিতে রয়েছে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের যথাযথ বাস্তবায়নের প্রয়াস। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, আওয়ামী লীগের ৬ দফায় তাই বিধৃত হয়েছে। কোনো ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের কথা সেখানে ছিল না।

চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য : ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। এ প্রেক্ষাপটে ’৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন এতে আন্দোলন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কর্মসূচির একটি নির্দেশনা পাওয়া গেলেও কোনো ধর্মনিরপেক্ষতার কথা সেখানে ছিল না। বরং ধর্ম বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে।

‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ’। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা সম্বলিত নির্দেশনা বা কোনো কিছুতেই ধর্মনিরপেক্ষতা বা এ জাতীয কিছু ছিল না বরং উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামী মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্য কামনা করা হয়।

স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায়ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়নি। বরং স্বাধীনতার লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে-In order to ensure for the peoples of Bangladesh equality, human dignity and social justice. অর্থাৎ স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা; কোনো তন্ত্রমন্ত্র কায়েম করা নয়। (দ্রষ্ট্রব্য : ‘স্বাধীনতা ঘোষণার লক্ষ্য’, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৯৮২, ৩য় খ-)।

আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পরদিন অর্থাৎ ১১ এপ্রিল ১৯৭১ নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জনগণের উদ্দেশ্যে যে বেতার ভাষণা দেন তাতে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নিরন্ন দুঃখী মানুষের রচিত হোক এক নতুন পৃথিবী যেখানে মানুষকে শোষণ করবে না। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক ক্ষুধা, রোগ, বেকারত্ব আর অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে মুক্তি। গড়ে উঠুক নতুন গণশক্তিকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা, গণমানুষের কল্যাণে সাম্য আর সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তরে লেখা হোক জয় বাংলা, জয় বাংলাদেশ।’ (ঐ, পৃ. ৮)।

অতএব পরিষ্কারভাবেই বলা যায়, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ মুক্তিযুদ্ধের কোনো লক্ষ্য ছিল না, তা মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক ফসলও নয়, এতে জনগণের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেনি। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সম্পৃক্ত করা নিছক বাইরে থেকে আরোপিত বিষয় মাত্র। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে দেশের সাধারণ জনগণের মনোভাবকে সামনে রেখে তেমনি রাস্ট্রের জনগনের মনোভাব এবং জন্মের ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সাবেক রাস্ট্রপতি এরশাদ ১৯৮৮ সালে ইসলাম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসাবে ঘোষণা করেন।

(লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও যুগ্ন-মহাসটিব, জাতীয় পার্টি)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ