আজ শনিবার, ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

রায়হান ইস্যুতেই ‘চাপা’ পড়ছে এমসির ধর্ষণকাণ্ড

  • আপডেট টাইম : October 29, 2020 11:24 AM

ডেস্ক রিপোর্ট : এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল ছিল সিলেট। দেশ-বিদেশের সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম ছিল এমসি’র ছাত্রাবাসের ধর্ষণকাণ্ড। শিক্ষাঙ্গনে ন্যাক্কারজনক এই ঘটনায় দেশব্যাপী আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। গণধর্ষণে জড়িত ছাত্রলীগ নেতারাও গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু অধরায় থেকে গেছেন তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতারা।

২৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে টানা দুই সপ্তাহ উত্তাল ছিল টিলাগড়। কিন্তু ১১ অক্টোবরের পর ক্ষোভ-বিক্ষোভের পয়েন্ট বদল হয়েছে। বদল হয়েছে ইস্যুও। টিলাগড়ের উত্তাল ঢেউ এখন নগরীর কোর্ট প্রাঙ্গণ কাঁপাচ্ছে পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুও ঘটনায়। ফলে সিলেট নগরীর টিলাগড় এখন নিরব-নিস্তব্ধ।

পয়েন্ট ও ইস্যু বদল হওয়া হাফ ছেড়েছেন ধর্ষকদের মদদদাতারাও। পক্ষকাল ধরে রাজপথে এ নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ হচ্ছে না। পরিবেশ শান্ত থাকায় ধর্ষকদের মদদদাতারা এখন অনেকটা নির্ভার। তাদেরকে কোনো অহেতুক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। এখন খোলস পাল্টানোর ধান্ধায় ব্যতিব্যস্ত তারা।

অথচ ক’দিন আগেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নানা কর্মসূচি নিয়ে সেখানে সরব ছিলেন সবশ্রেণী-পেশার মানুষ। যেন সবার ক্ষোভ-ক্রোধ আঁচড়ে পড়েছিল টিলাগড়ে। কলঙ্কমুক্ত হতে জনতার কাতারে দাঁড়াতে হয়েছে ধর্ষকদের মদদদাতাদেরও!

বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে যুবক রায়হান উদ্দিনের মৃত্যু ঘিরে নগরীর বন্দরবাজার তথা আদালত প্রাঙ্গণ এলাকা এখন উত্তাল রয়েছে। আর ইস্যু বদল হওয়ায় সুযোগ খোঁজছেন ধর্ষণকাণ্ডে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদেও মদদদাতারা।

১১ অক্টোবর রাত তিনটার দিকে রায়হানকে কোতোয়ালি থানার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে রায়হান মারা যান। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি পরদিন হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। মামলায় আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।

মামলার পর মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে ওই ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করে। আকবর ঘটনার পর থেকে পলাতক আছেন।

মামলাটির তদন্তভার পিবিআইয়ে কাছে হস্তান্তর করা হলে রায়হানের মরদেহ কবর থেকে তুলে পুনরায় ময়না তদন্ত করা হয়।

নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ফাঁড়ির ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও গায়েব, তথ্য গোপন করাসহ এসআই আকবরকে পালাতে সহায়তা করার অভিযোগে ২১ অক্টোবর ফাঁড়ির ‘টু-আইসি’ পদে থাকা এসআই হাসান উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

রায়হান নগরীর একটি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে চিকিৎসকের সহায়ক হিসেবে চাকরি করতেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় ‘বৃহত্তর আখালিয়া (বারো হামছায়া) সংগ্রাম পরিষদ’ নামে এলাকাবাসী বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে তৎপর রয়েছেন।

এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে এক তরুণীকে গণধর্ষণ করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। পরে রাত সাড়ে ১০টায় ওই তরুণীকে উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করে পুলিশ। মামলায় গ্রেফতার হওয়া আট আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাদের সবাই আদালতে নিজেদেও জড়িয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণকাণ্ডে যেভাবে সিলেটকে কলঙ্কিত করেছে। তেমনী বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নির্যাতনে নিরপরাধ যুবকের মৃত্যু ততটা কলঙ্কিত করেছে পুলিশ প্রশাসনকে। এ ঘটনার ১১ দিনের মাথায় তোপেরমুখে পড়া সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার গোলাম কিবরিয়াকে সিলেট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাকে বদলি করা হয় এসপিবিএন শাখায়। কমিশনার বদলের পর স্বস্তিতে নেই এসএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। অনেকেই আছেন বদলি-প্রত্যাহার আতঙ্কে।

সিলেট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, একটা অপরাধ আরেকটার কারণে চাপা পড়ুক এটা আমরাও চাই না। দু’টি ঘটনাই হেফাজতে ঘটেছে। গণধর্ষণের ঘটনা পবিত্র শিক্ষাঙ্গণে এবং রায়হান হত্যার ঘটনা পুলিশ হেফাজতে ঘটেছে। এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের গণধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে শাহপরান (র.) থানার ওসির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরাধি ও মদদদাতাদের সঙ্গে তার সখ্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আর করোনাকালে কলেজ বন্ধ থাকলেও অপরাধিরা ছাত্রাবাসে অবস্থান করায় হোস্টেল সুপারসহ সংশ্লিষ্টরা দায় এড়াতে পারেন না। তেমনী অপরাধি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতারাও রয়েছেন। মদদদাতা হিসেবে তাদের সকলকে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৩০ ধারায় আসামি করে চার্জশীটে অভিযুক্ত করার করার দাবি জানান তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সনাক) সিলেটের সমন্বয়ক ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা দু’টি ঘটনাকে সমানভাবেই দেখছি। দু’টিরই ন্যায় বিচার হোক। কিন্তু ন্যায় বিচার নিয়ে আমরা সংশয়ে আছি। কেননা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেটে এসে যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমরা রাজন হত্যা ও নারগিসের ন্যায় বিচার করেছি। আসামিদের বিদেশে থেকে ধরে এনেছি, এটা অসত্য। রাজনের হত্যাকারীদের প্রবাসীরা ধরে দিয়েছে। তাহলে কৃতিত্ব কোথায়? আর টিলাগড়ে একের পর এক হত্যাকেণ্ডের কয়টির বিচার হয়েছে। উদাহরণ যদি অহরহ দিতে পারতেন, মেনে নেওয়া যেতো। মূলত; দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজ করছে।

এছাড়া সিলেটে আন্দোলন-সংগ্রামে নাগরিক সমাজ একই প্লাটফর্মে থাকেন। রায়হান হত্যার ঘটনায় দলমত নির্বিশেষে সকলেই আন্দোলনে ছিলেন। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী রায়হানের বাড়ি ঘুওে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলন থেকে পিছু হটেছেন। আমরা বলছি, এমসি কলেজের ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ। তারা বলছেন, দুর্বৃত্ত।

তিনি বলেন, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনায় মদদদাতা হিসেবে শাহপরান থানার ওসি, কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও কলেজ কর্তৃপক্ষ জড়িত। একইভাবে হেফাজতে রায়হানের মৃত্যু ও এসআই আকবরের পলায়নে পুলিশ কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টরা দায় এড়াতে পারেন না। এজন্য সুপারভাইজিং অথরিটি হিসেবে পুলিশ কমিশনারকেও মামলায় আসামি করা প্রয়োজন।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ