আজ শুক্রবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

ডাক্তার

  • আপডেট টাইম : December 22, 2017 6:05 AM

প্রফেসর মো. আজিজুর রহমান লসকর : টেলিফোনে এপয়ন্টমেন্ট করে তুলি এক সকালে আমাকে নিয়ে গেল ডাক্তারের চেম্বারে। একতলা ছোট মার্কেটে ডাক্তারের চেম্বারসহ নানা রকমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমরা নির্দিষ্ট সময়ের চার মিনিট পূর্বে ওখানে পৌঁছি। ডাক্তারও একই সময়ে আসেন। ডাক্তার না বলে ডাক্তারনী বললে ভালো। কারণ তিনি একজন মহিলা নাম ডা. মনীষা রাউট; মূলত তিনি ভারতের মারাটার অধিবাসী। মনীষা শব্দটি বাংলা ভাষায়ও আছে। কেবল নাম নয় ভদ্রমহিলার চেহারার সাথেও বাংলাদেশের মানুষের মিল রয়েছে; গায়ের রং শ্যামলা, মাথায় লম্বা চুল বাঙালি রমণীদের মতো। বয়স ঠিক অনুমান করতে পারিনি। প্রথম পরিচয়ে কাউকে বয়স জিজ্ঞাসা করা যায় না, বিশেষ করে মহিলার ব্যাপারে। আর বয়স অনুমান করার জন্য একজন মহিলার প্রতি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকানো তো অসভ্যতার পর্যায় পড়ে! তবু মনে হল পঞ্চাশের উর্ধ্বে হয়ে থাকবে। সাথে তাঁর স্বামী ড. বিশ্বাস রাউট, ক্যামেস্ট্রিতে ডক্টোরেট। কিন্তু তাঁর জ্ঞান অনুযায়ী কোনো পেশায় নিয়োজিত নয়। স্ত্রীর সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছেন; বাড়ি কেনাবেচার ব্যবসায়ও জড়িত আছেন।
এখানে ডাক্তারের চেম্বারকে ক্লিনিক বলা হয়। ডাক্তার মনীষা চাবি দিয়ে ক্লিনিকের দরোজা খোললেন। আমরা তাঁকে অনুসরণ করলাম। ঢোকতেই দর্শনার্থীদের জন্য ছোট লম্বা কক্ষ। আমরা সেখানে বসলাম। কক্ষের ভেতরের অংশে সেক্রেটারির বসার নির্ধারিত স্থান। ডানদিকে ডাক্তারের কক্ষ। সেক্রেটারি মি. রাইট আমার হেলথ কার্ড নিয়ে নাম, জন্ম তারিখ, কার্ড নাম্বার ইত্যাদি দিয়ে একখানা প্যাড পূরণ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ডাক পড়লো। ডা. মনীষা তুলির পূর্ব পরিচিত। আন্তরিকতাপূর্ণ কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে তিনি আমার ব্লাড প্রেসার, হার্টবিট, ওজন ইত্যাদি পরীক্ষা করলেন। আমার নি¤œ মাত্রায় ডায়াবেটিস রয়েছে, তাকে জানালাম। আরো বললাম ডায়াবেটিস মাপার একটি যন্ত্র আমার প্রয়োজন। তাঁর আন্তরিক ব্যবহারের জন্য আমি তৃপ্তি বোধ করলাম এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানালাম। তিনি রক্ত, মল, মূত্র ইত্যাদির বিভিন্ন প্যাথোলজিক্যাল টেস্টের জন্য নির্দেশ দিলেন।
প্যাথোলজিক্যাল টেস্টের জন্য নমুনা প্রদানের আগে বারো ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে উপবাস থাকতে হলো। রাতের খাবার সন্ধ্যার সাথে সাথে খেয়ে নিয়েছিলাম। পরদিন সকালে নাস্তা না খেয়ে অর্থাৎ খালি পেটে আমি তুলি সাথে এক আধাসরকারি ক্লিনিকে উপস্থিত হলাম। তখন সকাল নয়টা বেজে গেছে। সরকারি ক্লিনিকে গেলে ফ্রি টেস্ট করানো যেত। কিন্তু সরকারি ক্লিনিকে ভীড় বেশি হয়, তাই তুলি ওদিকে পা বাড়ালো না। সম্ভবত একদিন পূর্বে ক্লিনিকে যাবার এপয়ন্টমেন্ট তুলি ফোনে নিয়েছিল। বারো ঘণ্টার উপবাস কালে পানি পানে কোনো বাধা ছিল না।
অল্পক্ষণের মধ্যে ডাক পেয়ে আমি পরীক্ষাগারে প্রবেশ করলাম। সাথে তুলি। পরীক্ষাগারটি অত্যন্ত পরিস্কার ও পরিপাটি। উপস্থিত প্যাথোলজিক্যাল টেকনিশিয়ান একজন অল্প বয়স্কা হালকা-পাতলা গড়নের সাদা চামড়ার তরুণী। মনে হলো আমার মেয়ে তুলির চেয়েও ছোট। ফ্রেঞ্চ ভাষায় কি বললো। আমি বুঝলাম না। সে মৃদু হাসলো। তুলির ইঙ্গিতে রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট উঁচু সরু খাটে শোয়ে পড়লাম। ইতোপূর্বে শীতের জ্যাকেট ও কোট খোলে ফেলেছিলাম। মেয়েটি আমার শার্টের হাত যথেষ্ট গুটিয়ে কনুইয়ের সংযোগস্থলের ভেইন থেকে ভেনাস ব্লাড নেবার ব্যবস্থা করলো। ভেইন স্পষ্ট করে তোলার জন্য মেয়েটি আমাকে হাত মুষ্টি বদ্ধ করতে ইঙ্গিত করলো। আমি স্কুলের শান্ত বালকের মতো নির্দেশ পালন করলাম। অতঃপর সম্ভবত স্পিরিট দিয়ে বাহুর নির্দিষ্ট জায়গাটি স্টেরিলাইজ করলো। একটি খালি ইন্জেকশনের সিরিঞ্জের সাথে যুক্ত বেশ বড় আকারের একটি সুঁই মূহুর্তে আমার হাতের ভেইনে ঢোকিয়ে দিল। অতি সামান্য ব্যথা পেলাম! বুঝতে পারলাম মেয়েটি তার কাজে দক্ষ। তারপর ঐ সিরিঞ্জের বিশেষ ব্যবস্থায় একটির পর আরেকটি রক্ত সংগ্রাহক কাচের টিউব দিয়ে মোট চার টিউব রক্ত সংগ্রহ করলো। আমার আন্দাজে প্রতি টিউব প্রায় ৭/৮ সি.মি. রক্ত ধারণ করছিল। তারপর সুঁই বের করে সম্ভবত এন্টিবায়োটিকযুক্ত তুলা দিয়ে সৃষ্ট ক্ষত স্থানটিকে ঢেকে আঠাযুক্ত ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দিল। আবার ফ্রেঞ্চ ভাষায় সম্ভবত জিজ্ঞেস করলো, কেমন বোধ করছি! আমি স্বগতভাবে উচ্চারণ করলাম, থ্যাঙ্কইউ! আই এ্যাম ওয়েল! বললাম, পরম আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে তুমি রক্ত চোষার নিষ্ঠুর কর্মটি সম্পন্ন করে নিলে! সে হাসল।
অতঃপর মেয়েটি টেস্টটিউব, ডিসপোজেবল গ্লাস ইত্যাদি আমার হাতে দিয়ে বললো যে, ইউরিনের স্যাম্পল সংগ্রহ করে আনতে। কাছেই টয়লেট, যা অত্যান্ত পরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধমুক্ত। লক্ষ করলাম টেস্ট টিউবের গায়ে জড়ানো ল্যাবেলে আমার নাম, জন্ম তারিখ ইত্যাদি হাতে লেখা নয়, প্রিণ্ট করা রয়েছে। ইতোপূর্বে দেখেছি রক্ত সংগ্রহের চারটি টিউবেও ঠিক এভাবে প্রিন্ট করে লিখা ছিল। এদেশে জনকল্যাণে নিয়োজিত কর্মচারীদের আন্তরিক কর্মতৎপরতা দেখে একদিকে যেমন অবাক হয়েছি অন্যদিকে এদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জন্মেছে।
স্টুল অর্থাৎ মল-এর নমুনা সংগ্রহের জন্য ঢাকনার ভিতরের দিকে প্লাস্টিকের ছোট্ট কাঠি বা শলাযুক্ত ছোট টিউব, বিশেষ ধরনের একটি সীট সাদা কাগজ, পলিথিন ব্যাগ, সংগ্রহের পদ্ধতি নির্দেশক লিফলেট ইত্যাদি দেয়া হল। এখানেও নমুনা সংগ্রহের ছোট টিউবের গায়ে আমার নাম, জন্ম তারিখ, হেলথ কার্ড নম্বর, নমুনা সংগ্রহের তারিখ (অপূণ) ইত্যাদি ছাপার অক্ষরে মুদ্রিত লেবেল আটকানো রয়েছে দেখতে পেলাম। তবে সেদিন ক্লিনিকে স্টুল এর নমুনা সংগ্রহের কাজ করলাম না। তা বাসায় এসে করেছিলাম। পরদিন বাসায় টয়লেটে গিয়ে লিখিত নির্দেশমতো প্রথমে নিজেকে অনাকাক্সিক্ষত জলমুক্ত করলাম। কারণ সংগৃহীত নমুনায় যেন ইউরিনের উপস্থিতি না থাকে, তা স্পষ্ট করে নির্দেশিকায় লেখা ছিল। অতঃপর হাইকমোডের পরিস্কার পানির উপর সরবরাহকৃত বিশেষ সাদা কাগজটি বিছিয়ে দিলাম। কাগজটি পানির উপর টাইটানিক জাহাজের মতো ভাসতে লাগলো। তারপর প্রাকৃতিক কর্মটি সম্পন্ন করে নমুনা সংরক্ষণের ছোট টিউবের ঢাকনার ভিতরের দিকের কাঠিতে আজকের জন্য ‘অতি মূল্যবান’ দ্রব্যের যৎসামান্য অংশ নিয়ে টিউবে সংরক্ষণ করলাম।
হঠাৎ প্রায় ষাট বছর আগের শৈশব-কৈশোরে শোনা এক ঘটনা মনে পড়লো। তখন সিলেট শহরে অতি অল্প লোকের বসবাস ছিল। ডাক্তার ছিলেন হাতে গোনা ক’জন মাত্র। একজন ছিলেন এল. এম. এফ. ডাক্তার। এল. এম. এফ অর্থাৎ লাইসেন্সিয়েট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি। তখন অধিকাংশ ডাক্তারই এল.এম.এফ ছিলেন। এখন নাই। দৈহিকভাবে তিনি ছিলেন খাটো আকারের। রোগী দেখার সাথে সাথে তিনি প্যাথোলজিক্যাল পরীক্ষাও করতেন। ডাক্তার সাহেবের বাসার সামনে বেশ বড় আকারের সাইনবোর্ডে তাঁর নাম, রক্ত-মল-মূত্র পরীক্ষার কথাসহ বড় অক্ষরে লেখা ছিল, ‘ডাক্তার সাহেবের একটি নিজস্ব অণুবীক্ষণ যন্ত্র আছে।’ তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আলোচনা হতো। যা হোক। শোনা কথা- একদিন একজন পুরাতন রোগী, যিনি মাঝে মধ্যে ডাক্তার সাহেবকে বাড়ির লাউ-কুমড়া, দুধ বা অন্য কিছু উপহার দিয়ে থাকেন, বড় পাতিলে ভালোভাবে মুখবন্ধ করে দই নিয়ে হাজির।
অতঃপর ডাক্তার সাহেব বরাবরের মতো রোগীকে পরীক্ষা করে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বিদায় করলেন।
দুপুরে খাবার শেষে ডাক্তার সাহেব স্ত্রীকে বললেন যে, দইয়ের পাতিল থেকে দই পরিবেশন করতে। স্ত্রী অত্যন্ত শক্ত করে মুখ বাঁধা দইয়ের পাতিল যতেœর সাথে খোলেই ‘ওয়াক থু’ বলে দৌড়ে পালিয়ে গেলেন! দুর্গন্ধ ইতোমধ্যে সমস্ত ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে!
প্যাথোলজিক্যাল টেস্টের জন্য যে যৎসামান্য নমুনাই যথেষ্ট সেকালের মানুষ তা জানতেন না। সেদিন আমি অবশ্যই যৎসামান্য নমুনা সংগ্রহ করেছিলাম এবং তুলি তা যথারীতি ক্লিনিকে জমা দিয়েছিল। এখানকার নিয়ম হচ্ছে, প্যাথোলজিক্যাল রিপোর্ট ক্লিনিক থেকে রোগীর কাছে নয়, সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে, আমার ক্ষেত্রে ডা. মনীষার কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। আমার কেইস ইমার্জেন্সি ছিল না, তাই রিপোর্ট ধীরে ধীরে যাবার কথা। ইতোমধ্যে বেশ কিছুদিন পার হয়ে গেল। ডা. মনীষার কাছ থেকে জানতে পারলাম, অনেক রকমের টেস্ট করা হলেও কোনো নেতিবাচক রিপোর্ট আসেনি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর! কেবল রক্তে কিঞ্চিত কলেস্টেরোলের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। ডা. মনীষা এজন্য অটরভ্যাস্টাটিন ক্যালসিয়াম এবং ডায়াবেটিসের জন্য মেটফরনিন হাইড্রোক্লরাইড টেবলেট গ্রহণের প্রেসক্রিপশন দিলেন। প্রেসক্রিপশনে ডায়াবেটিস মাপার যন্ত্রের কথাও উল্লেখ ছিল।
পরদিন একটি ফার্মেসিতে গেলে একজন মেয়ে কর্মচারী প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে পড়ে আমাকে বললো, দয়া করে বিশ মিনিট পরে আসুন। বিশ-পঁচিশ মিনিট পর ফিরে গিয়ে সেখানে অন্য এক মেয়েকে পেলাম। তাকে ঔষধের কথা এবং আমার নামও বললাম। সে একটি প্যাকেট নিয়ে এল এবং আমার বাসার ঠিকানা ও বাড়ির নাম্বার জিজ্ঞেস করলো। আমি যথারীতি নির্ভুল জবাব দিলাম। মনে হল ভেরিফাই করার জন্য মেয়েটি এ প্রশ্নগুলো করেছিল। তারপর সে আমাকে পাশের কাউন্টারে যেতে অনুরোধ করলো। ওখানে সাদা এপ্রন গায়ে এক ভদ্রলোক প্যাকেটটি খোলে কোন ঔষধ কিভাবে গ্রহণ করতে হবে তা বুঝিয়ে বলে দিল এবং ডায়াবেটিস মাত্রা মাপার যন্ত্রটির ব্যবহারও বাতলে দিল। উল্লেখ্য, ডায়াবেটিস যন্ত্রটি বিনামূল্যে আমাকে প্রদান করা হল। কিন্তু এ যন্ত্র সংশ্লিষ্ট সুঁই ও স্ট্রিপগুলোর মূল্য এবং ঔষধ সমূহের মূল্য আমাকে পরিশোধ করতে হলো। লক্ষণীয়, প্রেসক্রিপশনখানা আমার কাছে ফেরৎ দেয়া হলো না, ফার্মেসিতেই রেখে দেয়া হল। উল্লেখ্য, ঔষধের প্যাকেটের গায়ে আমার নাম, ডাক্তারের নাম এবং ঔষধের ব্যবহার বিধি প্রিন্ট করে লেখা ছিল। আরো উল্লেখ্য, কানাডাসহ জাগতিকভাবে উন্নত বিশ্বে কয়েকটি মাত্র সাধারণ ঔষধ ছাড়া ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ব্যতিত কোনো ঔষধ বিক্রি করা হয় না।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ