৭ জুন ২০২২


স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি

শেয়ার করুন

আজিজুল আম্বিয়া : দিনের পর দিন এ দেশের মধ্যবিত্ত মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ে দিশেহারা হয়ে নীরবে নীরবে নিজেদের অসহায়ত্বের চিত্র দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সরকার কিংবা সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়ে এ অসহায় মানুষগুলোর অনেক অভিযোগ। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ শোনারও কি সময় আছে সরকার কিংবা সুশীল সমাজের? তাই তাঁরা এ বিষয়ে আর বলতে চান না নতুন করে। কিন্তু যেখানে বাংলাদেশকে সারা বিশ্ব একটি সম্ভাবনার দেশ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। সেখানে কি একটি কল্যাণমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি নয়? আমাদের কি এ বিষয়ে চিন্তাভাবনার সময় হয়নি? নিঃসন্দেহে আমরা এই সময় অতিক্রম করছি। তবু কেন বিবেক জাগ্রত হচ্ছে না আর আমরা করতে পারছি না তার সুরাহা।

জাতির এ অবস্থায় আজ ভূপেন হাজারিকার গানের কথা মনে পড়ে যায়, ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু। আজকে আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে অন্তত এই অসহায় মানুষগুলোর কথা চিন্তা করে। দেশের এ ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য কিছু লোক লাভবান হচ্ছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব কম আমরা জানি। তবু কেন এত সময় নিতে হবে রাষ্ট্রকে—এ প্রশ্ন এখন প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের।

এবার আসুন আমরা দেখি কী কী সমস্যা রয়েছে এই স্বাস্থ্য খাতে, যা রোগীসেবার বিপরীতে কাজ করছে। আজকে যাদের টাকাপয়সা আছে এবং বিদেশমুখী, তাদের কাছে দেশে কিংবা বিদেশে সব জায়গাতেই চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই এ ব্যাপারে। আর তাঁরাই দেশ নামক একটি মহান রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তাঁদের মধ্যেও কিছু কিছু মানুষ যাঁরা চিকিৎসার জন্য দেশকে বেছে নেন, তাঁদের জন্য অপেক্ষা করে চরম হয়রানি আর বিচিত্র অভিজ্ঞতা। পক্ষান্তরে দেশের গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষগুলোকে নিতে হয় দেশীয় চিকিৎসা, যেতে হয় দেশের হাসপাতালগুলোতে। এখানে নানা অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হওয়ার খবরও মেলে। বেসরকারি হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস আর হার্টের রিং পরাতেও নানা অনিয়ম চোখে পড়ে। সরকারের নির্দিষ্ট দাম না থাকাতে মানুষের সঠিক ধারণার অভাবে হাসপাতালের মালিকেরা পুকুর চুরির বিরাট সুযোগ পান।

বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালে রোগীসেবা নিয়ে অভিযোগ আছে। সমস্যাগুলো সেই মান্ধাতার আমলের হলেও এখন পর্যন্ত বিদ্যমান। আমাদের দেশে অনেক বৃদ্ধ লোক আছেন, তাঁদের দেখভাল করার মানুষের বড়ই অভাব। তাই তাঁদের কথা চিন্তা করে সরকার যদি বিদেশের মতো কেয়ার হোমের ব্যবস্থা করে দিত, তবে এ অসহায় মানুষগুলো বৃদ্ধাশ্রমে গুমরে গুমরে আর কাঁদতে হতো না। যদিও এটি ব্যয়বহুল, তবু মানুষের মৌলিক চাহিদার কারণে লন্ডনের মতো যদি আমাদের দেশেও জিপি সিস্টেম চালু করা হয়, তবে দেশের সব মানুষের ডেটা এন্ট্রি করা থাকবে জিপিতে। তাই দেশের যেকোনো জায়গায় অসুস্থ হলে আপনি চিকিৎসা নিতে পারেন সেখান থেকে। রেকর্ড থেকে ডাক্তার রোগীর পূর্ববর্তী রোগ সম্পর্কে জানতে পেরে চিকিৎসা দিতে পারবেন একমুহূর্তে। ফোন করে রোগীর সিরিয়াল নিতে পারবেন রোগী এবং রোগ অনুযায়ী ডাক্তার পাবেন রোগী। সব ধরনের টেস্ট হবে সরকারি ল্যাবে, তাতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে। এ ক্ষেত্রে দালালেরা হারিয়ে যাবে খুব সহজেই। সরকার নিয়ন্ত্রিত ফার্মেসিতে থাকবে ওষুধ আর সেখান থেকে রোগীরা নিয়ে আসবেন ওষুধ। যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা মূল্য দেবেন আর দরিদ্ররা বিনা মূল্য পাবেন ওষুধ। ডাক্তারেরা থাকবেন সরকারি আয়ের ওপর নির্ভরশীল তাই ইচ্ছেমতো ওষুধ লেখা থেকে থাকবেন বিরত। গর্ভবতী নারীদের জন্য খোলা হবে দেশের সব অঞ্চলে একেকটি বার্থ সেন্টার। সেখানে স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করানো হবে যদি কোনো বড় অসুবিধা না হয়। বন্ধ হবে অস্ত্রোপচার–বাণিজ্য। হার্টের রিং, ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন সরকারের মাধ্যমে পাবে, ধনী লোক তা পাবে নির্ধারিত মূল্যে এবং গরিবেরা পাবে ফ্রি। লাইফ সাপোর্ট মেশিনও থাকবে সরকারি হাসপাতালে। জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ কল করলে আসবে অ্যাম্বুলেন্স।

প্রশ্ন আসতে পারে, এত টাকা সরকার কোথায় পাবে? বাংলাদেশ সরকার যদি ব্যাংক, বিদ্যুতের বিল, বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে যদি গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া যায় কিছু সময়ের জন্য, এ ছাড়া দেশের জনগণের ওপর বাড়তি ট্যাক্স ধার্য করা, তা ছাড়া জিপিতে নিবন্ধনের সময় একটা ফি নিলে এগুলো কাভার করা সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে একটি টিম লন্ডন সফর করে বিশাল অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে পারেন।

পরিশেষে বলব, দেশে অনেক চিকিৎসক আছেন গরিবের চিকিৎসা বিনা টাকায় করে দেন। তাঁরা রোগীদের যথেষ্ট সময় দেন, রোগ বুঝে খুব কম ওষুধ লেখেন এবং সব ধরনের অনৈতিক কাজ থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। স্যালুট জানাই সেই মহান সন্তানদের। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, আপনি পদ্মা সেতুর মতো বড় কাজ করে দেখিয়ে দিয়েছেন আপনার দ্বারা যেকোনো বড় মহৎ কাজ সম্ভব। তাই আমার অনুরোধ, আপনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এ রকম একটি স্বাস্থ্য নীতি ঘোষণা করেন।

(লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও লন্ডন অফিস ইনচার্জ, আজকের সিলেট ডটকম।)

শেয়ার করুন