১৬ জুন ২০২২


চার বছর ধরে বন্ধ পাথর কোয়ারি, শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন

শেয়ার করুন

নূর আহমদ (অতিথি প্রতিবেদক) : সিলেট অঞ্চলের পাথর কোয়ারিগুলো থেকে গত প্রায় চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে পাথর উত্তোলন। পাথরের যোগান না থাকায় বন্ধ রয়েছে কয়েক হাজার ক্রাশার মিল (পাথর ভাঙ্গার মেশিন)। যেসব ক্রাশার মিল আমদানি করা পাথর ভেঙ্গে কোনমতে চলছিলো; সেই মিলের চাকাও এবার বন্ধ হতে চলেছে। জকিগঞ্জ ও সুতারকান্দি শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভাঙ্গা পাথর (প্রক্রিয়াজাতকরণ) আমদানি শুরু হয়েছে। এতে মাথায় হাত পড়েছে ক্রাশার মিল মালিকদের। এমনিতেই লক্ষাধিক পাথর সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ব্যবসায়ী মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এবার ভাঙ্গা পাথর আমদানির খবরে অনেকটা পথে বসার উপক্রম হয়েছে তাদের। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিল মালিকরা সিলেটের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতাদের সাথে দেখা করে ভাঙ্গা পাথর আমদানি না করার দাবি জানিয়েছেন।

কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ, গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং এবং সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার পাথর কোয়ারি বন্ধ রয়েছে ২০১৮ সাল থেকে। তখন থেকে কোয়ারির পাথর উত্তোলন নির্ভর ব্যবসা বাণিজ্যে ভাটা পড়ে। শ্রমিকদের মাঝে শুরু হয় হাহাকার। লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। দেউলিয়া হয়ে পড়েন অনেক ব্যবসায়ী। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেকে হয়ে গেছেন সর্বস্বান্ত। এমনকি মর্গেজ দেয়া ঘর বাড়িও অনেকের নিলামে উঠে গেছে। মানবেতর জীবন যাপন করেছেন অনেকই।

এদিকে, পাথর ব্যবসার সাথে ক্রাশার মিল অপরিহার্য্য একটি খাত। ফলে ব্যবসায়ীরা পাথর ব্যবসার সাথে নিজেরাই পাথর ভাঙ্গার জন্য গড়ে তুলে ছিলেন ক্রাশার মিল। কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, ছাতক, তাহিরপুর, কানাইঘাট সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার ক্রাশার মিল রয়েছে। পাথর উত্তোলন বন্ধের সাথে সাথে সেই মিলগুলোও বন্ধ হতে চলেছে। অনেক এলাকায় মিল বন্ধ থাকতে থাকতে যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনাও ঘটছে। কেউ কেউ কেজি দরে পাথর ভাঙ্গার মিল বিক্রি করেছেন।

কোয়ারি বন্ধের সাথে সাথে দেখা গেছে যেসব ব্যবসায়ী আগে থেকেই আমদানি রপ্তানির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তারা পুনরায় জড়িয়ে পড়েন পাথর আমদানিতে। তাবামিল স্থলবন্দরসহ সিলেটের সবকটা শুল্ক স্টেশন দিয়ে শুরু হয় ভারত থেকে পাথর আমদানি। তাদের সাথে মিল মালিকরা আমদানি করা বোল্ডার (বড়) পাথর ভেঙ্গে কোন রকম জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করছিলেন । একই সাথে পাথর কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবিতে বৃহত্তর সিলেট পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে নানা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সম্প্রতি পাথর কোয়ারি, পাথর উত্তোলন, খাস আদায় এবং জব্দ পাথর উন্মুক্ত নিলামের বিষয়ে দায়ের করা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সিদ্ধান্ত দিয়েছে সরকার। এমন খবরে সিলেটের পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যবসায় ফেরার আশার সঞ্চার হয়েছে। তখনই নতুন করে সামনে এসেছে ভাঙ্গা পাথর আমদানির বিষয়টি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট সমস্যা নিরসনে গত ৩১ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন-মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব আনোয়ারুল ইসলাম। সভায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজে পাথর প্রধান কাঁচামাল বিবেচনায় পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দিলে দেশের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে মর্মে মন্তব্য করা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসককে (ডিসি) ও রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকদের চিঠি পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, পরিবেশগত ক্ষতি, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাহিদা ও জোগান, আমদানি সম্ভাব্যতা এবং আর্থিক বিষয়গুলো বিবেচনায় কৃষি জমি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বিদ্যমান গেজেটভুক্ত পাথর কোয়ারিগুলো পুনরায় ইজারা প্রদান করা যাবে কি না তা যাচাই করার লক্ষে জিওগ্রাফিক্যাল সার্ভে এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হলো। এ কমিটিতে ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য, বেসাময়িক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন, পানি সম্পদ মন্ত্রণায়, পরিবেশ অধিদফতর, বিভাগীয় কমিশনার, রংপুর, সিলেট এবং সিলেট এবং খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো এবং বাংলাদেশ তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।

গঠিত এ কমিটি গেজেটভুক্ত পাথর কোয়ারিগুলোর মজুদ পাথরের পরিমাণ, উত্তোলনযোগ্য পাথরের পরিমাণ, উত্তোলনের সময়কাল, পাথর কোয়ারির এলাকার পরিবেশ, নদীর নাব্যতা সঙ্কট বিবেচনায় মানব স্বাস্থ্য, কৃষি, ইকো-সিস্টেম, মৎস্য ও জীব-বৈচিত্রের ক্ষতি এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ বিবেচনা করে পাথর কোয়ারির তালিকা হালনাগাদ করবে। এই কমিটিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরো সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে। তা আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যস্থা গ্রহণ করবে।

অপরদিকে, সিলেটে আমদানি নির্ভর পাথর ব্যবসা চললেও সম্প্রতি মিল মালিকরা নতুন ইস্যু নিয়ে সামনে এসেছেন। তারা অভিযোগ করছেন, কিছু আমদানিকারক জকিগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে কুশিয়ারা নদী পথে জাহাজ দিয়ে ভাঙ্গা পাথর আমদানী করছেন। বিভিন্ন পন্থায় জাহাজে মালের পরিমাণ কম দেখিয়ে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ভাঙ্গা পাথর আমদানী করে নিয়ে আসছেন। একইভাবে বিয়ানীবাজারের সুতারকান্দি স্থল বন্দর দিয়েও প্রক্রিায়াজাতকরণ পাথর আমদানী করে সিলেটে ফেঞ্চুগঞ্জে ডাম্পিং করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন। এতে মিল মালিকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।

কোম্পানীগঞ্জ স্টোন ক্রাশার মিল মালিক এসোসিয়েশনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা: আব্দুন নুর জানান, কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ও সংলগ্ন এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক ক্রাশার মিল ছিল। এখন প্রায় সবকটি মিলই বন্ধ। এ কারণে ব্যবসায়ীরা বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন।

বৃহত্তর সিলেট পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের নেতা শাব্বির আহমদ বলেন, এমনিতেই কোয়ারি বন্ধ থাকায় মিল চলছে না। আমদানি করা বোল্ডার পাথর ভেঙ্গে কোন রকমে তাদের চলছিলো। এর মধ্যে কিছু আমদানিকারক বিদেশ থেকে বিভিন্ন রকম সাইজ করা ভাঙ্গা পাথর নদী পথে জকিগঞ্জ ও সুতারকান্দি দিয়ে দেশে নিয়ে আসছেন। এতে মিল মালিকরা পথে বসার উপক্রম। তিনি বলেন, লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার জীবন যাপন করছে। এভাবে ভাঙ্গা পাথর আমদানি অব্যাহত থাকলে মিলে শ্রম দিয়ে উপার্জনের পথটাও বন্ধ হয়ে যাবে। এমনিতেই ব্যাংক ঋণে জর্জরিত ব্যবসায়ীরা। অনেকই দেউলিয়া হয়ে গেছেন। শাব্বির আহমদ দ্রুত কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবি জানান।

বৃহত্তর সিলেট পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মোঃ নুরুল আমিন বলেন, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এভাবে ভারত থেকে ভাঙ্গা পাথর আমদানি অব্যাহত থাকলে আমাদের পথে বসা ছাড়া উপায় নেই। নূরুল আমিন জানান, তারা সিলেট চেম্বার নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করে বিষয়টি অবহিত করেছেন। তারা অনুরোধ জানিয়েছেন এর প্রতিকারের জন্য।

পাথর আমদানিকারক সিলেট চেম্বারের সহ-সভাপতি আতিক হোসেন জানান, তিনি নিজেও প্রক্রিয়াজাতকরণ পাথর আমদানি শুরু করেছিলেন। তবে ব্যবসায়ীদের অনুরোধে আপাতত বন্ধ রেখেছেন।

সিলেট চেম্বারের পরিচালক ভোলাগঞ্জ পাথর আমদানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান মিন্টু জানান, খুব বেশি নয় বর্তমানে ১০/১২ জন ব্যবসায়ী প্রক্রিয়াজাতকরণ পাথর আমদানিতে জড়িত রয়েছেন। মিল মালিকরা চেম্বারে এসে আমাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলছে।

বর্তমানে প্রক্রিয়াজাতকরণ পাথর আমদানিকারকদের অন্যতম সুনামগঞ্জের ছাতকের ব্যবসায়ী শাহ আলম। তিনি জানান, তারা সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করেই ভাঙ্গা পাথর আমদানি করছেন। তিনি দাবি করেন দেশের সবকটা পোর্ট দিয়ে ভাঙ্গা পাথর ঢুকছে। সিলেটে বর্ষা মৌসুমের ২/৩ মাস এই ভাঙ্গা পাথর দেশে আনা যাবে। এরপর নদীর নাব্যতা সংকটে এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। কোয়ারি বন্ধ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, তাই বলে ব্যবসা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের নতুন নতুন পথ খুঁজে বের করতে হবে।

সিলেট জেলা প্রশাসক মো: মজিবর রহমান জানান, কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। নতুন করে ইজারা সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা সম্পর্কে তার জানা নেই। যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে নির্দেশনা পেলে অবশ্যই সবাই জানতে পারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শেয়ার করুন