২২ জুন ২০২২


বন্যায় বহুমাত্রিক সংকটে সিলেট ও সুনামগঞ্জ

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : কয়েক দিন আগেও যাঁদের আধাপাকা বা টিন, ছন, বাঁশ ও মাটির ঘর ছিল- তাঁরা রাতারাতি ছিন্নমূল। অনেক এলাকায় ঘরের চালার ওপর দিয়ে বন্যার পানির স্রোত বয়ে গেছে। কিছু এলাকায় উঁচু গাছও পানির নিচে ডুবে গেছে। হাজার হাজার মানুষ কোনোরকমে নিজেদের জীবন বাঁচিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়া বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কের পাশে খুপরি ঘর তৈরি করে আশ্রয় নিয়েছেন। এ যেন বাস্তুচ্যুতির এক লোমহর্ষক চিত্র। পথে পথে হাজার দু:খগাথার নাম যেন সিলেট-সুনামগঞ্জ।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, দুই জেলার বিস্তীর্ণ গ্রাম এখনও পানির ওপর ভাসছে। বিশেষ করে পানি নেই এমন এক ইঞ্চি জায়গা এখন মিলবে না সুনামগঞ্জ জেলায়। বেশ কিছু সড়কে ছোট ছোট ছাউনি দিয়ে গরু-ছাগল রাখছেন দুর্গত মানুষ। কোনো বাসার ছাদের ওপরও গরু রাখতে দেখা গেছে। ঘরের নিচতলা-দোতলা পানির নিচে। ছাদে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে গরুর পাশাপাশি মানুষও থাকছেন!

শুধু বাস্তুচ্যুতিই নয়, বিভীষিকার এই দুই জনপদে এখন বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট। বৃষ্টির পানিই তাঁদের ভরসা। আর খাবার সংকট বর্ণনাতীত। সিলেটের ১৩টি উপজেলার মধ্যে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, বালাগঞ্জ ও জৈন্তাপুরে বন্যার তীব্রতা বেশী। আর সুনামগঞ্জের তো প্রায় সব উপজেলাই বন্যার ভয়াবহতার শিকার। এমন অনেক এলাকা আছে, যতদূর দু’চোখ যায়, সেখানেই শুধু জলরাশি। কিছু কিছু গ্রাম পুরোপুরি ডুবে আছে।

এদিকে, কালও সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। তবে কাল সকাল থেকে সিলেটে বৃষ্টি হয়নি। দুপুর থেকে অনেক কাঙ্খিত রোদের দেখাও মিলেছে। রোদের দেখা মিললেও মানুষের মুখে হাসি ফোটেনি একটুও। জেলায় প্রায় নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানির বিপদসীমা ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় সেখানে পানি ১৩ দশমিক ৮৪ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছিল। নদীর সিলেট পয়েন্টে পানির বিপদসীমা ১০ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় সেখানে পানি ছিল ১১ দশমিক ২৩ সেন্টিমিটার। কুশিয়ারা নদীর অমলশিদ পয়েন্টে বিপদসীমা ১৫ দশমিক ৪০ সেন্টিমিটার, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় সেখানে আগের দিনের চেয়ে পানি কিছুটা কমে ১৭ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার হয়েছে। নদীর শেওলা পয়েন্টে বিপদসীমা ১৩ দশমিক শূন্য ৫ সেন্টিমিটার, মঙ্গলবার সকালে সেখানে পানি অবস্থান করছে ১৩ দশমিক ৭২ সেন্টিমিটারে। কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি কিছুটা বেড়েছে। আর কুশিয়ারার ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমা ১০ দশমিক ৪৫ সেন্টিমিটার। সেখানে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল ১০ দশমিক ৫৩ সেন্টিমিটার। মঙ্গলবার সকালেও পানির অবস্থান অপরিবর্তিত আছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে কুশিয়ারা নদীর পানি ১৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অন্যদিকে খোয়াই নদের পানি ৮ দশমিক ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে, সুনামগঞ্জে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলেও বন্যার পানি আগের জায়গায়ই আছে। খুব ধীরগতিতে পানি নামছে। শহরের রাস্তাঘাট ও মানুষের বাড়িঘরে বন্যার অথৈ জলে ভাসছে। সবকটি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
পুরো জেলার মধ্যে সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী জেলায় প্রায় ৫০০ আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এ ছাড়া মানুষের উঁচু বাড়িঘর, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, যেখানেই সুযোগ পেয়েছে, সেখানেই বানভাসি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ শহরের কাছে মঙ্গলবার সকালে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ২৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এদিকে, হবিগঞ্জের খোয়াই ও কুশিয়ারা নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। এতে জেলার ৬টি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন নেই। এদিকে খোয়াই নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলা প্রশাসন মাইকিং করে শহরবাসীকে সতর্ক করে।

মৌলভীবাজারেও বন্যার কোন উন্নতি হয়নি। জেলার প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি। জেলা মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা যায়, বন্যার কারণে এ পর্যন্ত জেলার ৭টি উপজেলার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও মাদ্রাসাসহ ১৬১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

একই নগর, দুই চেহারা
নগরীর জিন্দাবাজার আর উপশহর। এক নগরেই দুই চেহারা। জিন্দাবাজারের দোকান খোলা। আর উপশহরসহ বিভিন্ন এলাকার দোকানপাট এখনও বন্ধ। একই অবস্থা নগরীর বাসাবাড়ির ক্ষেত্রেও। কোথাও পানি কমেছে, আবার কোথাও পানি এখনও রয়ে গেছে। উপশহরের মুল সড়কে এখনো হাঁটুপানি। কিছু কিছু এলাকায় পানি কমলেও অনেকেই ঝুঁকি নিতে নারাজ। কারণ আবারও বাড়তে পারে পানি- এমন আতঙ্ক এখনও আছে।

বন্যায় তছনছ রাস্তাঘাট
বন্যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের ১১ হাজার ৬৭০ কিলোমিটার রাস্তা একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। অনেক স্থানে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তার লেশমাত্র নেই। পানির তোড়ে ছোট, দুর্বল ও পুরোনো কালভার্ট-ব্রিজ উপড়ে গেছে। যেসব স্থানে পানি কমতে শুরু করেছে, সেখানে পানির নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে এবড়োখেবড়ো রাস্তা।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ নেই। ভাঙা রাস্তাঘাটের কারণে সুনামগঞ্জ ও সিলেটের মানুষের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হবে। এসব রাস্তা পুননির্মাণ ও মেরামত করে ব্যবহার উপযোগী করতে ব্যয় হবে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। সময়ও লাগবে বেশ।

সিলেট বিভাগের দায়িত্ব থেকে সাম্প্রতি প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত হওয়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গোপাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, এলজিইডির রাস্তাগুলো মেরামত করতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। আর নতুন করে তৈরি করতে খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ লাখ। কিন্তু বন্যার যে ভয়াবহতার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে অনেক স্থানেই নতুন করে রাস্তা তৈরি করতে হবে।

এলজিইডি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ দুটি জেলার প্রধান সড়ক ছাড়া বাকি সব রাস্তাই এলজিইডির আওতায় তৈরি। সুনামগঞ্জ জেলায় এলজিইডির রাস্তা আছে ৪ হাজার ১৬০ কিলোমিটার। সিলেট জেলায় আছে ৭ হাজার ৫১০ কিলোমিটার। এই ১১ হাজার ৬৭০ কিলোমিটার রাস্তার প্রায় পুরোটাই পানির নিচে তলিয়ে আছে।

এলজিইডি মনে করছে, বন্যায় রাস্তা যে মাত্রায় তছনছ ও কোথাও কোথাও উধাও হয়ে গেছে, তাতে মেরামত ও পুনর্র্নিমাণবাবদ প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ২৫ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। এ হিসাবে এসব রাস্তা আবার ব্যবহার উপযোগী করতে হলে ২ হাজার ৯১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে এলজিইডিকে। যেটা খুব দ্রæতই সম্ভব হবে না।

সিলেটে বন্যায় ২২ জনের মৃত্যু
ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের ২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটে ১৪ জন, সুনামগঞ্জে পাঁচ ও মৌলভীবাজারে ৩ জনের প্রাণহানি হয়েছে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক হিমাংশু লাল রায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পাহাড়ি ঢল আর বন্যায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিলেট বিভাগ। তার ওপর সিলেট নগরীর অধিকাংশ এলাকায় ৫ দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া উজানের পানি নামতে শুরু করায় সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার নিচু এলাকায় পানি বেড়েছে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

বন্যায় ২২ হাজার হেক্টর জমির আউশ আক্রান্ত
চলমান বন্যায় সুনামগঞ্জে ও সিলেটে ২২ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান আক্রান্ত হয়েছে। এ তথ্য জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিরুজিমাথ সামীরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, এছাড়াও শাকসবজি, তিল, বাদাম প্রভৃতি ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী না হলে এখন পর্যন্ত যতটুকু ক্ষতি হয়েছে, সেটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। এজন্য ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতিও শুরু করা হয়েছে।

ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশে আমন একটি বড় ফসল, যেখানে বছরে এক কোটি ৫০ লাখ টনের মতো চাল উৎপাদন হয়। এখন রোপা আমনের বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শেয়ার করুন