২৩ জুন ২০২২


আওয়ামী লীগের যাত্রাপথের সোনালি অর্জন

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : বাঙালি জাতির জাগরণ, জাতীয় চেতনার বিকাশ, হাজার বছরের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির জন্য গণজোয়ার, অকুতোভয় সংগ্রাম, জয় বাংলা স্লোগান, নৌকা প্রতীকে ভোটদান ও মহান স্বাধীনতা; এই সবকিছুর মূলেই রয়েছে একটি নাম- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত কোটি কোটির মানুষকে গনগনে সূর্যের মতো করে জাগিয়ে তুলেছে এই দল। বাঙালি জাতির প্রবাদ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশজুড়ে গণমানুষের দলে পরিণত হয় এটি। তিনি হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগের মধ্যমণি। আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথচলা একই সরলরেখায়, তাই কাউকে ছাড়া কারো ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। আর স্বাধীনতার পর আবার বিপর্যয়ের মুখে পড়া বাংলাদেশকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও জননেত্রী শেখ হাসিনা। এখানেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে আওয়ামী লীগ। আধুনিক বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা- একই সূত্রে গাঁথা। ৭৩ বছর বয়সের পরিণত এই দলটির হাত ধরে আজ বিশ্বের বুকে বিস্ময় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বাঙালি জাতি।

১৯৪৭ সাল। ভারতবর্ষ ভাগ হলো। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কিছুদিন আগে থেকেই ভবিষ্যত করণীয় প্রসঙ্গে কলকাতায় বৈঠক করতে থাকেন সেখানে অধ্যয়নরত বাঙালি তথা পূর্ববাংলার প্রতিষ্ঠিত ছাত্রনেতারা। দেশ ভাগের পরপরই ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন তাদের একটা বড় অংশ। আরেকটা অংশ কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলে বৈঠক করে দেশে ফেরেন। প্রতিষ্ঠিত ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ততোদিনে ঢাকায় এসে নতুন একটি যুব-সংগঠন করার পেছনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। যার ফলশ্রুতিতে ৭ সেপ্টেম্বর (১৯৪৭) গণতান্ত্রিক যুবলীগ নামের একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিলো নতুন দেশে উগ্র বাম বা উগ্র ডান উভয় পন্থা পরিহার করে, একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা।

কিন্তু শুরুতেই এটি কোন্দলের মধ্যে পড়ায়, ছাত্রদের নিয়ে নতুন ও গতিশীল সংগঠন গড়ার উদ্যোগ নেন শেখ মুজিবুর রহমান। যার ধারাবাহিকতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ছাত্রলীগ। এজন্য ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে কর্মীসভা ডেকে (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম) ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। ১৪ সদস্যের এই সাংগঠনিক কমিটির একজন সদস্য হিসেবে থাকেন তিনি নিজে।

বাংলা ভাষার আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দেয়ায়, ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল শেখ মুজিবকে আবারো গ্রেফতার করা হয়। মূলত ভাষা আন্দোলনে সামনে থেকে ভূমিকা রাখার কারণে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করে পুলিশ। একারণে বিভিন্ন অযুহাতে কারাগারে নেয়া হয় তাকে। এবার ছাত্রনেতা হিসেবে জেলে প্রবেশ করলেও, জেলখানাতেই তার ছাত্ররাজনীতির সমাপ্তি ঘটে। শেখ মুজিব জেলে থাকা অবস্থাতেই ২৩ জুন, কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডনে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী (মুসলিম) লীগ। শেখ মুজিবের নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে এই সংগঠনের প্রাতিষ্ঠাতা যুগ্মসাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২৭ জুন তিনি আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে জেল থেকে বের হন।

১৯৪৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার আরমানিটোলায় জনসমাবেশ করে আওয়ামী লীগ। সভা শেষে ভুখা মিছিল থেকে দলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার এড়িয়ে দলীয় কার্যক্রমের পরিসর বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানে যান সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি পূর্ব-বাংলায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান করার জন্য সোহরাওয়ার্দীকে রাজি করান। এরপর ঢাকায় ফেরার পর তাকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। এসময় গ্রেফতারে ভয়ে পদত্যাগ করেন অনেক আওয়ামী লীগ নেতা। অনেকে নিস্ক্রিয় হয়ে যান। ফলে নিজের দূরদর্শিতা এবং নেতৃত্বগুণে মাত্র ৩০ বছর বয়সেই দলের অপরিহার্য মুখ হয়ে পড়েন শেখ মুজিবুর রহমান। তার কথায় মুগ্ধ হয়ে ১৯৫০ সালের ১৮ ও ১৯ মার্চ নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন অখণ্ড বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীন সোহরাওয়ার্দী। পুরো পাকিস্তানজুড়ে একটি রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবের উদ্যোগে প্রাদেশিক দল থেকে পুরো পাকিস্তানের জাতীয় দলে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ।

এইদফায় গ্রেফতার করে ২৬ মাস জেলে রাখা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১৯৫২ সালের এপ্রিলে জেল থেকে বের হয়ে দেশের অধিকাংশ জেলায় রাজনৈতিক সফর করেন তিনি। দলের সভাপতি ভাসানী যেহেতু তখনো বন্দি, তাই প্রায় চার মাসজুড়ে নিরলস পরিশ্রম করে সারাদেশের কমিটি পুনর্গঠন করেন তরুণ নেতা শেখ মুজিব। মাত্র ৩২ বছর বয়সে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের পোস্টারে পরিণত হন তিনি।

১৯৫৩ সালের দিকে আওয়ামী লীগ নেতারা মুক্তি পেতে থাকেন। সেই বছরই, ৯ জুলাই আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল ডাকা হয়। মাওলানা ভাসানীকে সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে (পূর্ব পাকিস্তান) আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। মুসলিম লীগের ধর্মের খোলস উন্মোচন করে, আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল সরকার গঠন করে যুক্তফ্রন্ট। কিন্তু পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের কারণে মাত্র দুই মাসের কম সময় ব্যবধানে, ১৯৫৪ সালের ৩১ মে, যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে ইস্কান্দার মির্জাকে পূর্ব বাংলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। শেখ মুজিবসহ পূর্ব পাকিস্তান আইনপরিষদের ৩৫ জন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যায় এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ।

এদিকে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতি বাংলার মানুষের গণরায়ের ওপর ভিত্তি করে, ১৯৫৫ সালের ২২-২৩ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটিকে বাদ দেয়া হয়। দেশের সর্বসাধারণের সবার জন্য এই দলের দুয়ার খুলের দিতে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবের উদ্যোগেই এই বাস্তবায়িত হয়। প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে সদস্য হিসেবে জায়গা পান তাজউদ্দীন আহমদ।এরপর ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাদেশিক পরিষদের সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। মুখ্যমন্ত্রী হন দলের সহসভাপতি আতাউর রহমান খান। এই মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিবকে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ ও গ্রামীণ সহায়তাবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু দলের কাজে সময় দেয়ার জন্য মে মাসের শেষে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। দেশজুড়ে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগেক শক্তিশালী করার কাজে নিমগ্ন হয়ে যান তিনি।

১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ মুজিবর রহমান লাহোরে বিরোধী দলীয় সম্মেলনের সাবজেক্ট কমিটির বৈঠকে ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। কিন্তু তা গৃহীত হয় না। ফলে ঢাকায় ফিরে, ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির বৈঠকে তিনি এটি পাস করিয়ে নেন দলের কাছ থেকে। ১৮ ও ১৯ মার্চের কাউন্সিলে শেখ মুজিবকে সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি গঠিত হয়। ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ছয় দফা উত্থাপন করের আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান। দেশজুড়ে গণপ্রচারণা শুরু হয় ছয় দফার পক্ষে। কিন্তু পাকিস্তানি স্বৈরশাসক ও রাজনীতিকরা অস্ত্রের ভাষায় এই গণজাগরণ মোকাবিলার চেষ্টা করে। এর প্রতিবাদে ৭ জুন হরতাল কর্মসূচির ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগ। বিপরীতে সেদিন ১৪৪ ধারা জারি করে পাকিস্তানিরা। কিন্তু ছাত্র-জনতার পাশাপাশি শ্রমিকরাও রাজপথে নেমে আসে ছয় দফার সমর্থনে। জান্তাদের গুলিতে প্রাণ হারায় ১১ জন। এরপর গণগ্রেফতার শুরু হয়। একের পর এক আটক হতে থাকেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

গ্রাম-গ্রামান্তের মানুষ পর্যন্ত সোচ্চার হয়ে ওঠে ছয় দফার পক্ষে। আতঙ্কিত হয়ে ওঠে পাকিস্তানিরা। তাই বঙ্গবন্ধু যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। মাত্র দেড় মাসে বিভিন্ন জেলায় ৩২টি জনসভা করেন শেখ মুজিব। এরপর ১৯৬৬ সালের ৮ মে তাকে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘমেয়াদে জেলে রাখা হয়।

জেল থেকে বের হয়ে এসে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠে আওয়াজ তোলেন বঙ্গবন্ধু। সাত কোটি জনতা কণ্ঠ মেলায় তার সঙ্গে। প্রচণ্ড গণদাবির মুখে জাতীয় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি জান্তারা। পাকিস্তানিদের শোষণে শ্মশানে পরিণত হওয়া বাংলাকে আবার সোনার বাংলায় পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেন বঙ্গবন্ধু। ছয় দফার বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখান। ফলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একচেটিয়াভাবে ভোট দেয় আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে। যার ফলে, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টিতে সরাসরি ভোটে জিতে পুরো পাকিস্তানের এক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। এছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে সরাসরি ভোটে ২৮৮টি আসন লাভ করে বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার একমাত্র আস্থার জায়গার পরিণত হয় আওয়ামী লীগ।

১৯৭০ সালে জাতীয় নিরর্বাচনে সংরক্ষিত ৭ আসনসহ উভয় পাকিস্তান মিলে ৩১৩ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের মোট জয় করা আসন হয় ১৬৭টি। আবার প্রাদেশিক পরিষদের মোট ৩১০ আসনের মধ্যে সংরক্ষিত ১০ আসনসহ আওয়ামী লীগের মোট আসন হয় ২৯৮। বাংলার জনগণের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে দীর্ঘ দুই যুগের আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পথে এগুতে থাকেন আওয়ামী লীগ প্রধান প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু পাকিস্তানিরা ষড়যন্ত্র করে জনগণের রায়কে প্রত্যাখান করার পাঁয়তারা করতে থাকে। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে কৌশলে দেশবাসীকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করেন বঙ্গবন্ধু।

এরকম একটি পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাতে ঘুমন্তু বাঙালি জাতির ওপর গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানি জান্তারা। ফলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার স্পষ্ট ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। এর পরপরই গ্রেফতার করা হয় তাকে। নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানের নির্জন জেলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন আপামর বাঙালি। দীর্ঘ ৯ মাস রক্ষাক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এরপর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হন বঙ্গবন্ধু। ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরেন তিনি। ১২ জানুয়ারি দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এরপর প্রথমেই তিনি মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ১৯৭২ সালের ১২ মার্চ, ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশ থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। নিজেদের সামর্থ্য দিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও আওয়ামী লীগের ওপর দমনপীড়ন:
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর, স্বৈরশাসকদের হিংস্র থাবায় বিক্ষত হতে থাকে সোনার বাংলা। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। ১৫ আগস্টের কালরাতে বিদেশে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই দুহিতা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। স্বৈরশাসকরা যখন আওয়ামী লীগ ভেঙে দেওয়ার জন্য নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, ঠিক তখনই নেতাকর্মীদের আহ্বানে দলের হাল ধরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে জীবনের মায়া উপেক্ষা করে দল ও দেশকে বাঁচাতে দেশে ফেরেন তিনি।

শেখ হাসিনার হাত ধরে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা:
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। পঞ্চম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন জননেত্রী শেখ হাসিনা। এসময় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চাপ সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ। ফলে ফিরে আসে সংসদীয় গণতন্ত্র।

১৯৯৬ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে বিএনপির একটি সাজানো নির্বাচনের বিরুদ্ধে তিনি গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ তৎকালীন খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগে বাধ্য হন। এবং জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিপুল ভোটে জয় লাভ করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২১ বছর থমকে থাকার পর আবার চলতে শুরু হয় বাংলাদেশ।

সরকারের মেয়াদ শেষে সুন্দরভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা। কিন্তু ২০০০ সালে এক জনসভাকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতায় কোটালিপাড়ায় হেলিপ্যাডে এবং জনসভাস্থলে ৭৬ কেজি ও ৮৪ কেজি ওজনের দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছার পূর্বেই বোমাগুলো শনাক্ত হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের জনসভায় এক ডজনের বেশি গ্রেনেড হামলা চালানো হয় তার ওপর। তাকে বাঁচাতে মানববুহ্য রচনা করেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। বিএনপি-জামায়াতের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো এই হামলায় প্রাণ হারান ২৪ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। আহত হন কমপক্ষে ৩০০ জন।

১/১১ এর কালো ছায়া কাটিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অভিযাত্রা:
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি, সুশীল সমাজের ছদ্মবেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে সামরিক বাহিনীর কতিপয় সদস্য। মাইনাস টু ফর্মুলার নামে দেশের বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরানোর অপচেষ্টা শুরু হয়। ১৬ জুলাই গ্রেফতার করা হয় তাকে। মিথ্যা মামলায় ২০০৭ সালে দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে জেলে ঢোকানোর পর, একের পর এক মোট ১৩টি মামলা সাজানো হয় তার নামে। ২৪ জুলাই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সামনে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়।

জেল থেকে বের হয়ে, গণমানুষের ভাগ্য বদলের জন্য ‘দিন বদলের সনদ’ ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও দুঃসাহসী নেতৃত্বে ভর করে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আয়োজিত জাতীয় নির্বাচনে একচেটিয়া জয় লাভ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের জোট। জোটের মোট অর্জিত ২৬৭ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগই পায় ২৩০টি।

উন্নত বিশ্বের দিকে ধাবমান প্রিয় সোনার বাংলা:
৫১ বছরের বাংলাদেশে, অনেক ঝড়-ঝাপটা ও দুঃসময় কাটিয়ে সাড়ে ২৪ বছর দেশশাসন করার সুযোগ পেয়েছে আওয়ামী লীগ। এই সাড়ে ২৪ বছর আওয়ামী আমলের মধ্যে, ২১ বছরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর অদম্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের হাত ধরেই দেশ থেকে দূর হয়েছে ক্ষুধা ও দারিদ্র। লোড শেডিংয়ের অন্ধকার শেষে এখন আমরা শতভাগ বিদ্যুতায়নের দেশ। প্রত্যন্ত গ্রামের এখন পৌঁছে গেছে বিদ্যুতের আলো। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার মূল সড়কগুলো সব চার লেনে উন্নীত করার মাধ্যমে বৃদ্ধি পাচ্ছে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা ও যোগাযোগ। সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে, শত্রুদের চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে সরকার।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ও রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করে, ২০১৪ সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে, টানা তৃতীয় বার ও মোট চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ এখন উন্নত বিশ্বের তালিকায় নাম লেখানোর স্বপ্নময় পথ অতিক্রম করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন স্বপ্নের গণ্ডি ছড়িয়ে বিশ্বের বিস্ময় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বীরের জাতি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান ফিরে পেয়েছে বাঙালি জাতি।

গত এক যুগে দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থায় অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার, আওয়ামী লীগ সরকার তা চারগুণ বৃদ্ধি করেছে। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা বছরে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৪ টাকা। মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। এমনকি করোনা মহামারি মোকাবিলা করেও ঠিক রাখা সম্ভব হয়েছে দেশের অর্থনীতি। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ।

এদিকে, বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশের টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠার কারণে বিশ্বব্যাপী নজর কেড়েছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ।

এছাড়াও জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে লিঙ্গ সমতা, রফতানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষপণ, রফতানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। নিজস্ব অর্থায়নে নান্দনিক পদ্মা সেতু, পারমাণবিক বিদ্যুৎকন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পসমূহ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরের পথচলার সোনালি অর্জনের নাম বাংলাদেশ। এই রাষ্ট্র ও জাতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য আওয়ামী লীগের নিরলস লড়াই চলমান রয়েছে। সংগ্রাম ও স্নেহ-ভালোবাসায় একাকার হয়ে, আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ- এক অপরের হৃদয়ের স্পন্দনে পরিণত হয়েছে। বাঙালি জাতি জয় বাংলা বলে প্রতিনিয়ত আগে বাড়বে।

শেয়ার করুন