আতঙ্কের নাম সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক
মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ০৫:৫৭ AM

সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে ছয় মাসে ঝরেছে ৪১ প্রাণ

আতঙ্কের নাম সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২/০৮/২০২৫ ০৭:০০:৩৭ PM

আতঙ্কের নাম সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক


এখন আতঙ্কের আরেক নাম সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক। জেলা শহর থেকে রাজধানী ঢাকা ও সিলেটের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দিন দিন এই সড়কটি মানুষের জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। এই সড়কে গত ছয় মাসে বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪১ জন নারী ও পুরুষ।

এক লেনের সরু এই মহাসড়কে প্রতিদিনই বাস, সিএনজি অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের ভিড়ে লেগে থাকছে জ্যাম ও দুর্ঘটনা। সড়কটিতে দুর্ঘটনার হার বেড়েই চলেছে। পরিবার হারাচ্ছে সন্তান, সন্তান হারাচ্ছে বাবা-মা। কান্নায় ভাসছে গ্রাম, গ্রামান্তর।

সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ৬ আগস্ট। সুনামগঞ্জের বাহাদুরপুরে বাস ও সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনজন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা জাহান খুশি এবং সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া স্নেহা চক্রবর্তী। দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে গোটা জেলায় নেমে আসে শোকের ছায়া। রাস্তায় নামে দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী। তারা ঘাতক বাস চালকের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালকের সংখ্যাই বেশি। প্রায় ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশার মধ্যে মাত্র ৪,৫০০টিরই বৈধ নিবন্ধন রয়েছে। বাকিগুলো চলছে অবৈধভাবে। অনেক চালকের কোনো লাইসেন্সই নেই। কেউ কেউ এক যুগ ধরে গাড়ি চালালেও কখনো লাইসেন্সের দরকার মনে করেননি। অন্যদিকে সড়কে চলাচলকারী এক হাজারেরও বেশি বাসের অনেকগুলোরই নেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিংবা ফিটনেস সনদ। আর বাস-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষ প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সড়কে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একটি আধুনিক মহাসড়ক যেখানে দুই লেনে হওয়ার কথা, সেখানে এক লেনের সরু পথ দিয়ে বিপজ্জনকভাবে চলছে যাত্রীবাহী যানবাহন। সড়কটি দুই লেনে উন্নীত করার প্রকল্প অনেক আগেই গৃহীত হলেও তা আটকে আছে মন্ত্রণালয়ের ফাইলের ভেতরে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, সড়কে শুধু অদক্ষতা নয়, অনেক চালকই মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে নিয়মিত কোনো পরীক্ষা বা নজরদারি নেই। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শেখ আব্দুল লতিফ বলেন, চালকদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা যাচাই করা জরুরি। সেই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।

বিআরটিএ'র সহকারী পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, যারা হালকা যানবাহনের লাইসেন্স নিয়ে ভারী যান চালাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুনামগঞ্জ জেলা ট্রাফিক অফিসের পরিদর্শক মো. হানিফ মিয়াও স্বীকার করেছেন, চালকদের অদক্ষতা এই সড়কে দুর্ঘটনার মূল কারণ। তবে তিনি জানান, ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কটি এখন আর শুধু একটি চলাচলের পথ নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর সংবাদ। এই সড়কে যে কেউ যেকোনোদিন শিকার হতে পারেন একটি ফিটনেসবিহীন বাস কিংবা একটি অবৈধ সিএনজির। প্রশাসনের দৃষ্টি, কার্যকর ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা ছাড়া এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না- এমনটাই বলছেন জেলার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সচেতন মহল।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর