কিছুতেই থামছে না টিলা কাটা, বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০২:৪৬ PM

কিছুতেই থামছে না টিলা কাটা, বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪/০৯/২০২৫ ১০:০৫:২০ AM

কিছুতেই থামছে না টিলা কাটা, বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি


সিলেটের পাহাড়-টিলাগুলো এখন ক্রমাগত ধ্বংসের মুখে। প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করেই নানান কৌশলে চলছে টিলা কাটা। কখনো রাতের আঁধারে, কখনো মাটি কাটার যন্ত্রপাতি ঢেকে রেখে দিনের বেলায়Ñএই সব উপায়ে অপরিকল্পিতভাবে টিলা ধ্বংস করা হচ্ছে। বাড়ি নির্মাণ, জমি সমতলকরণ এবং মাটি বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত টিলা কাটা অব্যাহত আছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত দুই দশকে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিলা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। এতে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষায় পাহাড় ধস, ভূমি ক্ষয় এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। সিলেটে ১০ বছরে টিলা ধসে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তর ও হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।

তারা বলছেন, কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো সম্ভব নয়। টিলা রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর বালুচর, মলাইটিলা, ব্রাহ্মণশাসন, হাওলদারপাড়া, খাদিমপাড়া, মেজরটিলা, দুসকি, টিলারগাঁও, খাদিমনগর, খাদিমপাড়া, গুয়াবাড়ী, জাহাঙ্গীরনগর, আখালিয়া বড়গুল এলাকার মুক্তিযোদ্ধা টিলা, নালিয়া, সাহেববাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গোপনে পাহাড় টিলা কাটা অব্যহত আছে। কোথাও প্রকাশ্যে আবার কোথাও রাতে কাটা হচ্ছে টিলা।

নালিয়ার বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, ‘এগুলো সবাই প্রভাবশালীদের মাধ্যমে কাটে। প্রকাশ্যে কেউ কাটে না। কে কাটে বা কারা কাটে এইগুলো কিছুই আমরা দেখি না।’

সিলেটে কি পরিমান টিলা ছিল, এর সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) জানিয়েছে, জেলায় ১ হাজার ২৫টি ছোট-বড় টিলা ছিল। নগর এবং সদর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় থাকা এসব টিলার আয়তন ২৫১ একর। সব উপজেলাতেই কমবেশি টিলা কাটা হচ্ছে।

পরিবেশবাদী একাধিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগের আড়াই দশকে সিলেটে অন্তত ৩০ শতাংশ টিলা সাবাড় হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর অবাধে টিলা কাটা চলে। এ সময় অন্তত ১৫ শতাংশ টিলার মাটি কমবেশি সাবাড় হয়। ২০২৪ সালের আগে-পরে ৪৫ শতাংশ টিলা পুরোপুরি বা আংশিক সাবাড় হয়েছে।

বেলার ২০২২-২৩ সালের জরিপ বলছে, সিলেট বিভাগে মাত্র ১ হাজার ৮৭৫টি পাহাড় আর টিলা ভ‚মি ছিল ৪ হাজার ৮১১.৬১ একরের। অথচ ২০০২ সালের হিসেব অনুযায়ী যা প্রায় অর্ধেক। পরিবেশ কর্মীরা বলছেন গত কয়েক বছরে অন্তত ৪৫ শতাংশ টিলা ভ‚মি কমেছে।

সূত্র জানায়, সিলেটের টিলাগুলো সাধারণত অব্যবহৃত ভ‚মি হিসেবে পড়ে আছে। টিলার মতো ভূমির মূল্য কম হওয়ায় মালিকরা টিলাগুলো কেটে আবাসন উপযোগী করে থাকেন। এ ছাড়া প্রভাবশালীরা বিভিন্ন মালিকের কাছ থেকে টিলা কিনে মাটি কেটে আবাসন প্রকল্পও গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘদিন ধরে টিলা ধ্বংসের এই যজ্ঞ চলে আসছে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে লোকদেখানো অভিযান ও জরিমানা করেই দায়িত্ব পালন করেন সংশ্লিষ্টরা। আর প্রভাবশালীরা জরিমানা পরিশোধ করে পুনরায় শুরু করেন টিলা কাটা।

অবশ্য সিলেট পরিবশে অধিদপ্তরের দাবি, পাহাড় ও টিলা কাটার অভিযোগের ভিত্তিতে বিগত তিন বছরে তারা শতাধিক অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা অর্থদন্ড আদায়, সেই সাথে ২৫টি অভিযানে ২১ ব্যক্তিকে নানা মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়।

পরিবেশবাদীরা জানান, এই ধ্বংস যজ্ঞে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি প্রভাবশালী ব্যক্তি, আবাসন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকরা জড়িত। এর সত্যতা মিলেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়ের করা মামলায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৯ এপ্রিল সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর গ্রামে টিলা কাটার অভিযোগে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

মামলায় আসামি করা হয় সদর উপজেলা বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক খান, সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক আজিজ খান সজীব ও টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. হাফিজুর রহমানকে।

এদিকে, গত ২৬ জানুয়ারি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলা কাটার ঘটনায় ৪০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। মামলায় কাঁঠালবাড়ি গ্রামের বিএনপি সমর্থক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রধান আসামি করা হয়।

এছাড়া মনির মিয়া, আবদুল করিম, আবদুর রশিদ, আইয়ুব আলী, আঞ্জু মিয়া, সোহরাব আলী, তৈয়ব আলী, বতুল্লাহ মিয়া প্রমুখকে আসামি করা হয়। তাঁরা সবাই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

বেলার বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, এখানে রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার একটা ঘাটতি রয়েছে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দিয়ে আর্থিক মুনাফা লাভের বড় একটা সুযোগ রয়েছে আর এই লোভের জায়গা থেকেই মদদ পাচ্ছেন।

তিনি বলেন সিলেটে এখনো যেসব টিলা অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। মামলাভুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ টিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড টানাতে হবে। যেসব টিলা কাটা হয়েছে সেগুলোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পূরঃকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, যেই টিলাগুলো কাটা হয়েছে সেই টিলাগুলো কাটা সায়েন্টিফিক পন্থায় কাটা হয়নি। যার ফলে ভ‚মি ধ্বসের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গিয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের পরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার জানান, অনেক সময় আমাদের লজিস্টিকের কারণে যখন টিলা কাটে সেই সময়ে যেতে পারি না। যদিও যেতে পারি তখন জরিমানা করতে পারছি কিন্তু মূল যে অপরাধী তাকে ধরতে পারছি না। এজন্য আমাদের লোকবল বাড়ানো দরকার। অভিযান, মামলা দায়েরসহ নানা পদক্ষেপের কারণে এখন আগের চেয়ে টিলা কাটা অনেক কমেছে বলে তিনি দাবি করেন।

সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনূর রুবাইয়াৎ বলেন, সরকারি কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন, কোনো টিলাই কাটা যাবে না। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেছেন, সিলেটের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে সিলেটে টিলা ও পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ করে নোটিশ জারি করা হয়েছে। টিলা কাটায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর