টাইব্রেকারে গেলেই বিপদ ইংল্যান্ডের
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ১১:১৯ PM

টাইব্রেকারে গেলেই বিপদ ইংল্যান্ডের

ক্রীড়া ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪/০৭/২০২৬ ০৭:৫৫:৫০ PM

টাইব্রেকারে গেলেই বিপদ ইংল্যান্ডের

এমি মার্তিনেজ ও পিকফোর্ড (ডানে)।


আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচে জিতবে কোন দল? উত্তরটা আপাতত তোলা থাক, অপেক্ষা করা যাক বুধবার পর্যন্ত। তবে এই সময়ে চোখ রাখা যেতে পারে দল দুটোর আদ্যোপান্তে। কারণ, বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার দেশটির সঙ্গে ইংলিশদের হিসাবটা শুধুই জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এখানে হাজির হওয়ার অপেক্ষায় ইতিহাস ও দুই দেশের ভূরাজনৈতিক নানা বিষয়।

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অফ গড’, ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ স্মৃতি যেমন ভেসে উঠবে, তেমনি হাজির হবে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। কিংবা ১৯৯৮ সালে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার চমকের পরও টাইব্রেকারে গড়িয়ে যাওয়া ম্যাচের ইতোবৃত্তটাও।

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার মুখোমুখি লড়াইয়ে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে ইংলিশরা। ফলে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও এবার আর্জেন্টিনার সামনে সুযোগ সমতায় ফেরার, একই সঙ্গে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার। আর ভাগ্যগুণে যদি ম্যাচটি অতিরিক্ত সময় পেরিয়ে টাইব্রেকারে গিয়ে ঠেকে, তবে চিত্রটা ভিন্ন হতে পারে।

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দুই জয়ের একটি এসেছিল টাইব্রেকার মাড়িয়ে, সেটি ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে। সেবার ২ (৪)-২ (৩) ব্যবধানে জিতেছিল তারা। আলবিসেলেস্তেদের গোলপোস্টের অতন্দ্রপ্রহরী ছিলেন কার্লোস রোয়া। এবার রয়েছৈন এমন একজন, যাঁর ক্যারিশমাটিক পারফরম্যান্সে ভর করে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। কিলিয়ান এমবাপেদের সেবার একাই থামিয়ে দিয়েছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল ম্যাচটি যদি টাইব্রেকারে গড়ায়, তবে জর্ডান পিকফোর্ডের সঙ্গে দারুণ এক লড়াই হবে ‘দিবু’ মার্তিনেজের। আর এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে পাল্লাটা আলবিসেলেস্তেদের দিকেই হেলে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

চরম স্নায়ুচাপের মুখে গোলপোস্টের নিচে দুজনই বড় ভরসার নাম হলেও পরিসংখ্যান, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং বড় টুর্নামেন্টের সাফল্যের বিচারে মার্তিনেজকে এই মুহূর্তে টাইব্রেকারের অবিসংবাদিত রাজা বলা চলে। আলবিসেলেস্তেদের হয়ে অংশ নেওয়া ৪টি টাইব্রেকারের সবকটিতেই দলকে জিতিয়েছেন তিনি। এরমধ্যে ২০২১ কোপা আমেরিকা ও ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ও ফাইনাল উল্লেখযোগ্য।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মার্টিনেজের পেনাল্টি শট সেভের হার ৪৬ শতাংশ। ২৪টি শটের মধ্যে ১১টি ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। এই গোলকিপার প্রতিপক্ষ শুটারদের ওপর এমন মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেন বলেই ফিফা (আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা) পরবর্তীতে পেনাল্টিতে গোলকিপারদের আচরণের নিয়মই বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে।

অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের হয়ে টাইব্রেকারের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার ইতিহাস বদলে দেওয়া নায়ক জর্ডান পিকফোর্ড। বড় টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের হয়ে ৪টি টাইব্রেকারের ৩টিতেই জয় এনে দিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ ২০২৪ ইউরোর সুইজারল্যান্ড ম্যাচে নিজের জলের বোতলে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি নেওয়ার অভ্যাসের চিরকুট লিখে রাখার চিরচেনা বৈজ্ঞানিক কৌশলে পিকফোর্ড দারুণ সফল হলেও ক্যারিয়ারের সামগ্রিক পেনাল্টি সেভের হারে (প্রায় ২১ শতাংশ) মার্তিনেজের চেয়ে তিনি কিছুটা পিছিয়ে। 

পিকফোর্ড যেখানে তাঁর অসাধারণ রিফ্লেক্স ও নিখুঁত হোমওয়ার্কের ওপর ভরসা করেন, মার্তিনেজ সেখানে অতিমানবীয় সেভের সঙ্গে যোগ করেন মাঠের আগ্রাসী মাইন্ড গেম; যা টাইব্রেকারে আর্জেন্টাইন তারকাকে পিকফোর্ডের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রেখেছে।

তবে ম্যাচ যদি টাইব্রেকারে না গড়ায়, সে ক্ষেত্রে কিছুটা ভুগতে পারেন মার্তিনেজ। বিশেষ করে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে বড় কোনো পরীক্ষার মুখে না পড়া এই গোলকিপার নকআউটে এসে গোল হজম করেছেন দুটি। তাছাড়া ডি-বক্সের ভেতর তিনি মাঝে মাঝে কিছুটা খেই হারিয়ে ফেলেন। তাঁর পুরো ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি গোল হজম হয়েছে বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া শটে, যা প্রায় ৭৫ শতাংশ। 

গত ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে মার্তিনেজের বিপক্ষে নেওয়া শটের ‘শট ম্যাপ’ বলছে, গোলপোস্টের বাঁ প্রান্তে শট নেওয়ার সংখ্যা যেমন বেশি ছিল, সেখানে গোল হজমের হারও বেশি ছিল। আরেকটি দুর্বলতা হলো—মাটি ঘেঁষা (লো ড্রাইভেন) শটের বিপক্ষে মার্তিনেজকে কিছুটা দুর্বল দেখায়। এখন দেখার বিষয়, রোমাঞ্চকর এই ম্যাচটি কোথায় গিয়ে থামে—নির্ধারিত সময়েই শেষ হয়, নাকি অতিরিক্ত সময় পেরিয়ে ফয়সালা হয় টাইব্রেকারে।

এর আগে আরেকটি স্ট্যাট জানিয়ে রাখা ভালো, ২৩তম বিশ্বকাপে নিজ নিজ দেশের হয়ে টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত সমান ৬টি করে ম্যাচ খেলেছেন পিকফোর্ড ও মার্তিনেজ। মাঠের খেলায় তাদের কার্যকারিতাও বেশ কাছাকাছি; দুজনেই টুর্নামেন্টে ২টি করে ক্লিন শিট রাখতে সক্ষম হয়েছেন এবং সমান ৬টি করে গোল হজম করেছেন। তবে গোলবারের নিচে শট ঠেকানোর ক্ষেত্রে পিকফোর্ড কিছুটা ব্যস্ত সময় পার করেছেন, যেখানে তাঁর সেভের সংখ্যা ১২টি আর মার্তিনেজের সেভ সংখ্যা ৮টি।Sports

বল ডিস্ট্রিবিউশন এবং বক্সের বাইরে এসে বিপদমুক্ত করার ক্ষেত্রে মার্তিনেজের চেয়ে বেশ এগিয়ে পিকফোর্ড। পুরো টুর্নামেন্টে পিকফোর্ড যেখানে ১৪৩টি নিখুঁত পাস দিয়েছেন, সেখানে মার্তিনেজের সফল পাসের সংখ্যা ১২৬টি। ডিফেন্সকে সাহায্য করতে বল ক্লিয়ার করার ক্ষেত্রেও পিকফোর্ড অনেকটাই সক্রিয়। ম্যাচ প্রতি তাঁর ক্লিয়ারেন্সের গড় যেখানে ২.৭, মার্তিনেজের ক্ষেত্রে সেটি মাত্র ০.৫। 

সামগ্রিকভাবে এই পরিসংখ্যান বলছে, গোল হজম ও ক্লিন শিটের মূল জায়গায় দুজন সমান অবস্থানে থাকলেও আক্রমণ গড়ে তোলা এবং রক্ষণাত্মক সক্রিয়তায় পিকফোর্ড কিছুটা এগিয়ে আছেন। তবে বিষয়টা যদি টাইব্রেকারে গিয়ে গড়ায়, এলোমেলো হয়ে যেতে পারে সকল হিসাব নিকাশ।

আজকের সিলেট/এপি

সিলেটজুড়ে


মহানগর