তাহাজ্জুদ রাতের নীরবতা যখন গভীরতম হয়, তখন মহান প্রভুর সান্নিধ্যে দাঁড়ানোর এক অতুলনীয় মুহূর্ত। এটি রাসুল (স.)-এর প্রতি ফরজকৃত একটি মহান বিধান, যা পরবর্তীতে উম্মতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁর প্রিয়নবী (স.)-কে সম্বোধন করে ইরশাদ করেছেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করুন; এটি আপনার জন্য একটি অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায় যে, আপনার রব আপনাকে মাকামে মাহমুদে (উচ্চ মর্যাদার আসনে) প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা ইসরা: ৭৯)
রাসুল (স.)-এর তাহাজ্জুদে পড়া দোয়া
রাসুলুল্লাহ (স.) তাহাজ্জুদে নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়তেন
দোয়ার আরবি: اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيِّمُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ، لَكَ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ، وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ، وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ الْحَقُّ، وَوَعْدُكَ الْحَقُّ، وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ، وَقَوْلُكَ حَقٌّ، وَالْجَنَّةُ حَقٌّ، وَالنَّارُ حَقٌّ، وَالنَّبِيُّونَ حَقٌّ، وَمُحَمَّدٌ صلى الله عليه وسلم حَقٌّ، وَالسَّاعَةُ حَقٌّ، اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ، وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ، وَبِكَ خَاصَمْتُ، وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ، فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ، وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ، أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ ـ أَوْ لاَ إِلَهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু আংতা কায়্যিমুস সামাওয়অতি ওয়াল আরদি ওয়া মান ফিহিন্না ওয়া লাকালহামদু। লাকা মুলকুস সামাওয়অতি ওয়াল আরদি ওয়া মান ফিহিন্না। ওয়া লাকাল হামদু আংতা নুরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। ওয়া লাকাল হামদু আংতাল হাক্কু। ওয়া ওয়া’দুকাল হাক্কু। ওয়া লিক্বাউকা হাক্কু। ওয়াল ঝান্নাতু হাক্কু। ওয়ান নারু হাক্কু। ওয়ান নাবিয়্যুনা হাক্কু। ওয়া মুহাম্মাদুন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা হাক্কু। ওয়াস সাআতু হাক্কু। আল্লাহুম্মা লাকা আসলামতু। ওয়াবিকা আমাংতু ওয়া আলাইকা তাওয়াক্কালতু। ওয়া ইলাইকা আনাবতু। ওয়া বিকা খাসামতু। ওয়া ইলাইকা হাকামতু। ফাগফিরলি মা কাদ্দামতু ওয়া মা আখ্খারতু। ওয়া মা আসরারতু ওয়া মা আ’লাংতু। আংতাল মুকাদ্দিমু ওয়া আংতাল মুআখ্খিরু। লা ইলাহা ইল্লা আংতা। লা ইলাহা গাইরুকা।’ (বুখারি)
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! সব প্রশংসা আপনারই। আপনি আসমান-জমিন ও তাতে অবস্থানকারী সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। আপনার জন্যই সব প্রশংসা, আসমান-জমিনের কর্তৃত্ব আপনারই। আপনি আসমান-জমিনের নূর, আপনি সত্য, আপনার ওয়াদা সত্য, আপনার সাথে সাক্ষাত সত্য, আপনার বাণী সত্য, জান্নাত-জাহান্নাম সত্য, নবিগণ সত্য, হযরত মুহাম্মদ (সা.) সত্য এবং কিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম, আপনার উপর ঈমান আনলাম, আপনার উপর ভরসা করলাম, আপনার দিকেই ফিরলাম, আপনার সন্তুষ্টির জন্য বিতর্ক করলাম এবং আপনাকে হাকিম মানলাম। তাই আমার আগে-পরে, গোপনে-প্রকাশ্যে করা সব গুনাহ মাফ করুন। আপনিই তো অগ্রপশ্চাতের মালিক। আপনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই।’ (সহিহ বুখারি: ১১২০)
রাসুল (স.) তাহাজ্জুদে সুরা আল ইমরানের শেষ আয়াতগুলো (১৯০-২০০) তেলাওয়াত করতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল (স.) ঘুমালেন, তারপর রাতের অর্ধেক বা তার কিছু আগে অথবা কিছু পরে জেগে উঠলেন। তিনি তার হাত দিয়ে মুখ থেকে ঘুমের চিহ্ন মুছতে লাগলেন, তারপর সুরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত তেলাওয়াত করলেন। এরপর তিনি অজু করলেন এবং খুব সুন্দরভাবে অজু সম্পন্ন করলেন, তারপর তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। (সহিহ বুখারি: ১৮৩, সহিহ মুসলিম: ৭৬৩)
সুরা আলে ইমরানের শেষ ১০ আয়াত
১৯১. الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىَ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে, ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে, (তারা বলে) পরওয়ারদেগার! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদেরকে তুমি দোজখের শাস্তি থেকে বাঁচাও।’
১৯২. رَبَّنَا إِنَّكَ مَن تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ ‘হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয় তুমি যাকে দোজখে নিক্ষেপ করলে তাকে অপমানিত করলে; আর জালেমদের জন্যে তো সাহায্যকারী নেই।’
১৯৩. رَّبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلإِيمَانِ أَنْ آمِنُواْ بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الأبْرَارِ ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহবানকারীকে ইমানের প্রতি আহবান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ইমান আন; তাই আমরা ইমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সকল গোনাহ মাফ কর এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দুর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে।’
১৯৪. رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدتَّنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلاَ تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لاَ تُخْلِفُ الْمِيعَادَ ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দাও, যা তুমি ওয়াদা করেছ তোমার রাসুলগণের মাধ্যমে এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে তুমি অপমানিত করো না। নিশ্চয় তুমি ওয়াদা খেলাফ করো না।’
১৯৫. فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لاَ أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى بَعْضُكُم مِّن بَعْضٍ فَالَّذِينَ هَاجَرُواْ وَأُخْرِجُواْ مِن دِيَارِهِمْ وَأُوذُواْ فِي سَبِيلِي وَقَاتَلُواْ وَقُتِلُواْ لأُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلأُدْخِلَنَّهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ ثَوَابًا مِّن عِندِ اللّهِ وَاللّهُ عِندَهُ حُسْنُ الثَّوَابِ ‘অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দোয়া এই বলে কবুল করে নিলেন যে, আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। তোমরা পরস্পর এক। তারপর সে সমস্ত লোক যারা হিজরত করেছে, তাদেরকে নিজেদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রতি উৎপীড়ন করা হয়েছে আমার পথে এবং যারা লড়াই করেছে ও মৃত্যুবরণ করেছে, অবশ্যই আমি তাদের উপর থেকে অকল্যাণকে অপসারিত করব। এবং তাদেরকে প্রবেশ করাবো জান্নাতে যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। এই হলো বিনিময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম বিনিময়।’
১৯৬. لاَ يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُواْ فِي الْبِلاَدِ ‘নগরীতে কাফেরদের চাল-চলন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয়।’
১৯৭. مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ ‘এটা হলো সামান্য ভোগবিলাস-এরপর তাদের ঠিকানা হবে দোজখ। আর সেটি হলো অতি নিকৃষ্ট অবস্থান।’
১৯৮. لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْاْ رَبَّهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نُزُلاً مِّنْ عِندِ اللّهِ وَمَا عِندَ اللّهِ خَيْرٌ لِّلأَبْرَارِ ‘কিন্তু যারা ভয় করে নিজেদের পালনকর্তাকে তাদের জন্যে রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে প্রস্রবণ। তাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সদা আপ্যায়ন চলতে থাকবে। আর যা আল্লাহর নিকট রয়েছে, তা সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম।’
১৯৯. وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَن يُؤْمِنُ بِاللّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلّهِ لاَ يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللّهِ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَـئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ إِنَّ اللّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ ‘আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর ওপর ইমান আনে এবং যা কিছু তোমার ওপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লাহর আয়াতসমুহকে স্বল্পমুল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক যাদের জন্য বিনিময় রয়েছে তাদের পালনকর্তার কাছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন।’
২০০. يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اصْبِرُواْ وَصَابِرُواْ وَرَابِطُواْ وَاتَّقُواْ اللّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ‘হে ঈমানদানগণ! ধৈর্য্য ধারণ কর এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা সফল হতে পার।’
তাহাজ্জুদ নামাজ বান্দাকে আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্যে পৌঁছায়। রাসুল (সা.)-এর শেখানো দোয়া ও আয়াতগুলো তাহাজ্জুদে পড়ার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের চেষ্টা করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাহাজ্জুদ আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।
আজকের সিলেট/এপি
ধর্ম ও জীবন ডেস্ক 












