মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেই প্রকৃত মুমিন হওয়া যায় না। প্রকৃত মুমিন হতে হলে কিছু নৈতিক গুণ অর্জন করা অপরিহার্য; যার অন্যতম হলো দয়ার্দ্র ও হিতাকাঙ্ক্ষী হওয়া। মুমিন এমন ব্যক্তি, যার হৃদয়ে অন্যের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও করুণার সঞ্চার ঘটে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয়, মন্দ থেকে বিরত রাখে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। এদেরই ওপর আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন।’ (সুরা তাওবা: ৭১)
মুমিনদের পারস্পরিক দয়া
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, হৃদ্যতা ও কোমলতার ক্ষেত্রে মুমিনদের উদাহরণ এক দেহের মতো। দেহের এক অঙ্গে ব্যথা হলে পুরো দেহ বিনিদ্রা ও জ্বরে কাতর হয়ে পড়ে।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৩৫০; সহিহ বুখারি: ৬০১১)
একজন প্রকৃত মুমিন তাই নিজের মতো অন্যের সুখ-দুঃখে অংশ নেয়, অন্যের কষ্টে ব্যথিত হয়।
হজরত আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা দয়ালুদের উপর দয়া ও অনুগ্রহ করেন, যারা জমিনে বসবাসকারীদের প্রতি দয়া করবেন। দয়া রাহমান হতে উদগত। যে লোক দয়ার সম্পর্ক বজায় রাখে আল্লাহ তাআলাও তার সাথে নিজ সম্পর্ক বজায় রাখেন। যে লোক দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করেন।’ (তিরমিজি: ১৯২৪)
রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৩; সহিহ মুসলিম: ২৩১৯)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘কেবল হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর ও দুর্ভাগা মানুষের কাছ থেকেই দয়া ছিনিয়ে নেয়া হয়।’ (তিরমিজি: ১৯২৩)
স্নেহ-মমতার দৃষ্টান্ত
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (স.) একবার হাসান (রা.)-কে চুমু খাওয়ার সময় উপস্থিত সাহাবি আকরা বিন হাবিস বললেন, ‘আমার ১০ সন্তান আছে; তাদের কাউকেই কখনো চুমু খাইনি।’ তখন নবীজী (স.) বলেন, ‘যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।’ (বুখারি: ৫৯৯৭)
এই শিক্ষা শুধু পারিবারিক স্নেহে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজজীবনের প্রতিটি সম্পর্কেই দয়ার প্রকাশ ঘটাতে হবে।
নবী করিম (স.) শুধু মানুষের প্রতিই নয়, প্রাণীজগতের প্রতিও দয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘এক পতিতা মহিলাকে মাফ করে দেওয়া হলো, কারণ সে একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল।’ (মেশকাত: ১৯০২)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘এক মহিলা একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। সে তাকে খাবার দিত না এবং ছেড়েও দিত না যাতে সে পোকা মাকড় খেতে পারে। এ কারণে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে।’ (বুখারি: ৩৩১৮)
ঐতিহাসিক শিক্ষা: এক নবী ও পিঁপড়ার ঘটনা
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘কোনো এক নবীকে একটি পিঁপড়ে কামড় দিলে তিনি সেই পিঁপড়ার বস্তি জ্বালিয়ে দেন। তখন আল্লাহ তাআলা ওহি পাঠালেন- ‘তোমাকে তো একটি পিঁপড়ে দংশন করেছিল, আর তুমি এমন এক জাতিকে ধ্বংস করলে, যারা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করত।’ (নাসায়ি: ৪৩৫৯)
এ ঘটনার মাধ্যমে শিক্ষা হলো- এমনকি ক্ষুদ্রতম প্রাণীকেও অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া আল্লাহর নিকট নিন্দনীয়।
প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ নবীজির শিক্ষা
একদা রাসুলুল্লাহ (স.) এমন একটি উটের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন যে, অনাহারে উটটির পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিলো। তিনি বললেন, তোমরা এসব বাকশক্তিহীন পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ সবল পশুর পিঠে আরোহণ করবে এবং এদেরকে উত্তমরূপে আহার করাবে।’ (আবু দাউদ: ২৫৪৮)
মোটকথা, দয়া ও করুণা হলো ঈমানের প্রাণ। যে দয়া করে না, সে আল্লাহর দয়া থেকেও বঞ্চিত হয়। মুমিনের হৃদয় কোমল, সে মানুষ ও প্রাণ উভয়ের প্রতিই দয়াশীল। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবন এই দয়ারই জীবন্ত দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে সেই মানবিক গুণ, সহমর্মিতা ও দয়ার অনুভূতি জাগিয়ে তুলুন। আমিন।
আজকের সিলেট/এপি
ধর্ম ও জীবন ডেস্ক 








