ফসল বাঁচাতে বাঁশের মাচায় রাত কাটাচ্ছেন কৃষকেরা
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ০৮:১৬ PM

ফসল বাঁচাতে বাঁশের মাচায় রাত কাটাচ্ছেন কৃষকেরা

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২/১১/২০২৫ ০৬:২৯:৩৭ PM

ফসল বাঁচাতে বাঁশের মাচায় রাত কাটাচ্ছেন কৃষকেরা


মৌলভীবাজারের  কমলগঞ্জ উপজেলায় অন্ধকার হলেই ফসলি জমিতে নেমে আসে বুনো বন্য শূকরের দল। আর দিনে বানরেরা দেয় দলবলে হানা। এ সব বন্যপ্রাণীরা এসে নষ্ট করে ফেলে ফসলি জমি। ফলে এদের হাত থেকে ফসল রক্ষায় দিনরাত পালাক্রমে পাহারা দিয়ে থাকেন কৃষকরা। এক মাস ধরে প্রায় চার-পাঁচটি এলাকায় চলছে এই তাণ্ডব। পাকা ধান ঘরে তোলার সময় এই ভোগান্তিতে ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায় , রাতেই সমস্যা হয় বেশি। বন্যপ্রাণীর দল রাতের অন্ধকারে হানা দিয়ে পাকা ধান বা সবজির ক্ষেত নষ্ট করে ফেলে। এতে তাদের বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই পণ্ড হয়ে যায়। এই ক্ষতি এড়াতে, অনেক কৃষক দলবদ্ধভাবে বাঁশ, টিনের শব্দ এবং লাঠিসোটা হাতে সারারাত জমিতে পাহারা দেন।

কৃষকেরা অভিযোগ করে জানান, উপজেলার সদর ইউনিয়নের লংগুরপার, দক্ষিণ বালিগাঁও, বাঘমারা, সরইবাড়ি, ভেড়াছড়া, ছাতকছড়া এলাকার ফসলি জমিতে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বুনো শূকর প্রতি রাতে হানা দেয়। পাকা আমন ধান ও শীতকালীন সবজি ক্ষেতে শূকরের দল এসে তা নষ্ট করে। ধান, আলু, মুলা এমনকি কলাগাছসহ বিভিন্ন গাছ উপড়ে ফেলে। শূকর তাড়ানোর চেষ্টা করলে উল্টো সে মানুষকে ধাওয়া করে। সারাদিন কাজ করে আবার রাত জেগে ফসল পাহারা দিতে হয়।

কৃষকেরা বুনো শূকরের হানায় ফসল মাঠে রাখতে পারছেন না। শীতের মধ্যে পাকা ধান রক্ষায় মাঠে বাঁশ দিয়ে মাচা তৈরি করে পাহারা দিচ্ছেন কৃষকেরা। সেসময় সঙ্গে রাখছেন প্লাস্টিক ও টিনের তৈরি ড্রাম। কিছুক্ষণ পর শব্দ করে চিৎকার করেন, যাতে শূকর চলে যায়। কৃষক মফিজ মিয়া ফসলি মাঠে বাঁশ দিয়ে ৬ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মাচা তৈরি করে রাতে বসে থাকেন শূকর তাড়ানোর জন্য।

মফিজ মিয়া বলেন, ‘শূকর আমাদের সব ফসল নষ্ট করে ফেলছে। এ অবস্থায় প্লাস্টিক ও টিনের ড্রামের শব্দ করে রাত জেগে ফসল পাহারা দিতে হয়। এসব শূকর মানুষকেও আক্রমণ করে। এ কারণে ৬ ফুট উঁচুতে বাঁশের মাচা তৈরি করেছি, যাতে বন্য শূকর আক্রমণ করতে না পারে।’

মফিজ মিয়ার মতো এভাবে মাচা তৈরি করে রাতভর পাহারা দিচ্ছেন কৃষক কনাই মিয়া, আবুল মিয়া ও আশিক মিয়া। ফসল কাটার আগ পর্যন্ত চলবে তাঁদের পাহারা দেওয়ার কাজ। তবে বুনো শূকরের আক্রমণ ঠেকাতে এখন পর্যন্ত সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে দাবি করেন কৃষকেরা।

এদিকে তীব্র শীতের রাতে ফসল পাহারা দেওয়া রাতজাগা মাধবপুর এলাকার এই কৃষকের নাম সুফি মিয়া। বন্যশূকরের ক্ষতির হাত থেকে ফলসকে রক্ষা করতেই তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ধানের সঙ্গে শীতের রাত্রীযাপন কৃষক সুফি মিয়া। তিনি থাকেন কমলগঞ্জ উপজেলার বাগবাড়ি এলাকায়।

সুফি জানান, ‘বনোরতা’ (বনের প্রাণীরা) আমার সব ফসল নষ্ট করে দেয়। তাই নিজেই ধানগুলো রক্ষার জন্য পাহারা দেই। একটি-দুটি নয়, একসঙ্গে ১০ থেকে ১৫টির দল নামে। দেখে ভয় লাগে তখন। টর্চ মেরে জোরে জোরে শব্দ করলে তারা পালিয়ে যায়। সন্ধ্যা ৭টা/৮টার দিকে তারা নামে। আবার আসে মাঝরাতে। পুরো রাত জেগে ধান পাহারা না দিলে জমির সব ধান নষ্ট করে দিতে চায় তারা। দিনে আবার বানরের দলও নেমে আসে।

এ বিষয়ে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজারের সহকারী বন সংরক্ষক জামিল মোহাম্মদ খান জানান, বন্যপ্রাণীর নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নেই। বন্যপ্রাণীরা খাবারের জন্য লোকালয়ে যেতে পারে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বুনো শূকরের বংশবিস্তার আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শূকরের দলের বনের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে বিচরণ করা স্বাভাবিক বিষয় হলেও ফসল নষ্ট হওয়ায় ঘটনা দুঃখজনক। তবে বন্যপ্রাণী হত্যা একটা দন্ডনীয় অপরাধ। কেউ যেন প্রাণী মারার জন্য মরণফাঁদ ব্যবহার না করে। যদি সেটা করে তাহলে আইনের আওতায় আনা হবে।

আজকের সিলেট/জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর