হবিগঞ্জের পুরাতন খোয়াই নদী উদ্ধার অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া ৩০টি দালানকোঠাসহ দেড়শ’ অবৈধ স্থাপনার ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর সেই জায়গায় আবার পাকা ঘরবাড়ি গড়ে উঠছে। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ধারাবাহিকভাবে শুরু হয়নি স্থগিত করা উচ্ছেদ অভিযান।
২০১৯ সালে ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতাল থেকে নারিকেল হাটা পর্যন্ত নদী দখল করে গড়ে তোলা ৬০০ অবৈধ স্থাপনার তালিকা করে জেলা প্রশাসন। তবে বাস্তবে স্থাপনার সংখ্যা আরও বেশি।
অনেক প্রতীক্ষার পর ২০১৯ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবির মুরাদ তালিকা করেন ৬০০ দখলদারের, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয় মাছুলিয়া থেকে। মুসলিম কোয়ার্টার পর্যন্ত ৩০টি বহুতল ভবনসহ দুই দফায় দেড়শ’ স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে দখলদাররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং কয়েকদিনের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকের বদলির আদেশ দেয়। অভিযোগ রয়েছে, দখলদাররা আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ে লেনদেনের মাধ্যমে তা কার্যকর করিয়েছেন।
খোয়াই নদীর পাড়ে ভেঙে ফেলা স্থাপনা
জেলা প্রশাসক বদলির মধ্য দিয়ে সাহসী অভিযান শেষ হয়; এরপর গত ছয় বছর ধরে নদী উদ্ধারের উদ্যোগ শুরু হয়নি। এই সময়ের মধ্যে আরও চারজন জেলা প্রশাসক পরিবর্তন হয়েছেন। প্রত্যেকেই যোগদানের পর প্রথম বেঠকে নদী উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু অভিযান শুরু করতে পারেননি; তাদের দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে চলে গেছেন।
অবহেলায় পড়ে নদীর আড়াই কিলোমিটার এলাকা খোয়াই রিভার সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প। যার প্রাথমিক বাজেট এক হাজার ৮৭২ কোটি টাকা, পরে দুই হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হলেও প্রকল্প আটকে যায়।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া ৩০ দালানকোঠাসহ দেড়শ’ অবৈধ স্থাপনার ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সেই জায়গায় আবার স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। দিন দিন নতুন স্থাপনা বাড়ছে এবং দখলের কারণে নদী অনেক স্থানে সরু হয়ে খালে পরিণত হয়েছে।
আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ আন্দোলন
গত পাঁচ বছরে শতাধিক কর্মসূচি পালন করেছে বাপা ও খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপারসহ বিভিন্ন সংগঠন, নদী ও সরকারি জায়গা উদ্ধারের দাবিতে। নদীর পাড়ে দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কনসহ বিচিত্র প্রতিবাদ চালানো হয়েছে। তখন এই বিষয়ে জোর বক্তব্য দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও। তবে নদী রক্ষার আন্দোলন সীমিত থেকে যায় জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি এবং বেলার আইনি নোটিশ পর্যন্ত।
পুরোনো খোয়াই নদী
বাপা হবিগঞ্জের সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী মমিন বলেন, “আমরা বারবার আন্দোলন করেছি, স্মারকলিপি দিয়েছি। জেলা প্রশাসকগণ নদী উদ্ধারের আশ্বাসও দিয়েছেন। কিন্তু কাজের বাস্তবায়ন কেউই করতে পারেননি। সম্প্রতি দেখলাম, পৌর প্রশাসকও পুনরায় পুরান খোয়াই উদ্ধার বিষয়ে কথা বলেছেন, তবু কাজের কোনো অগ্রগতি দেখতে পাইনি।”
ফের আশার আলো
পুরাতন খোয়াই নদী উদ্ধার আন্দোলন নতুন উদ্দীপনা পেয়েছে। অতীতে উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পেছনে দখলদারদের অর্থ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দায়ী হলেও এখন আর রাজনৈতিক সরকার নেই। স্থানীয়রা আশা করছেন নবাগত জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীনের নেতৃত্বে নদী দখল ও দূষণমুক্ত হবে।
হবিগঞ্জ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. শামছুল হুদা বলেন, “জেলা প্রশাসক যোগদান করেই দুর্নীতিবিরোধী গণশুনানির মাধ্যমে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছেন। আশা করছি, তিনি নদী উদ্ধারে ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেবেন।”
বাপা হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, “পুরাতন খোয়াই নদীতে নারকেল হাটা থেকে মাছুলিয়া পর্যন্ত নৌকা চলাচল করত। মানুষ যানবাহনের পাশাপাশি নৌকায় মালামালও আনা-নেওয়া করত। তখন যানজটও হতো না। আমরা নদীটিকে ইতালির ভ্যানিস বন্দরের মতো উপলব্ধি করতাম। এখন নদী দখল ও দূষণের কারণে সরু খালে পরিণত হয়েছে, যেন ময়লার ভাগাড়। সামান্য বৃষ্টিতেই শহর জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ নদী পানি ধারণ করছে না। একমাত্র সমাধান হলো নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করা। যে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে কাজটি সফল হবে তিনি হবিগঞ্জবাসীর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।”
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি 








