সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বিলপাড় এলাকা। নামের সঙ্গে ‘বিল’ যুক্ত থাকলেও বাস্তবে সেখানে আর আগের মতো কোনো জলাশয় নেই। একসময় যে বিল, পুকুর আর ডুবা ছিল প্রাকৃতিক পানি ধারণের জায়গা, সেগুলো ভরাট করে গড়ে উঠেছে সারি সারি বহুতল ভবন। এতে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেই বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ডাউকি ফল্টলাইন থেকে সুনামগঞ্জের দূরত্ব মাত্র প্রায় ৬০ কিলোমিটার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফল্টলাইনের প্রভাবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু জলাশয় ভরাট করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে সুনামগঞ্জের ঝুঁকি দিন দিন আরও বেড়ে চলেছে।
শুধু বিলপাড় নয়, পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকাতেই একই চিত্র। হাওর, ডুবা, পুকুর কিংবা খাল—যেখানে জলাধার ছিল, সেখানেই তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন। এসব নির্মাণে মানা হচ্ছে না বিল্ডিং কোড, সেটব্যাক কিংবা নির্মাণ নীতিমালা। ফলে ভূমিকম্প হলে এসব স্থাপনা বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, ‘সুনামগঞ্জ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা—এটা নতুন কিছু নয়। ডাউকি ফল্টের কারণে আমরা প্রায়ই ভূকম্পন অনুভব করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভূমিকম্প মোকাবিলায় আমাদের কোনো কার্যকর প্রস্তুতি নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডুবা ও জলাধারের ওপর অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখনই যদি পরিকল্পিত নগরায়ণের উদ্যোগ না নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ হবে।’
চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ ও সিলেট এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ছাতক। এর আগে ২১ নভেম্বর পাঁচ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পে পুরো জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনা নতুন করে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য অ্যাডভোকেট খলিল রহমান বলেন, ‘সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞরা আগেই বলেছেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জ বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আমরা দেখি, কোনো দুর্যোগের পর আলোচনা হয়, আগে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয় না।’ তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘ভূমিকম্প হলে কী করণীয়, ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার—এসব বিষয়ে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, পৌর এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নির্মাণ বিধিমালা মানা হচ্ছে কি না, সেটি তদারকি করা জরুরি। প্রশাসন ও পৌরসভার নানা স্তরে উদাসীনতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ থামানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে দেরিতে হলেও পৌর কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। পৌর প্রশাসক মো. মতিউর রহমান খান বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পরই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে কমিটি করা হয়েছে। তারা ওয়ার্ডভিত্তিক পরিদর্শন করে দেখছে ভবনগুলো অনুমোদিত নকশা ও বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে কি না।’
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট মালিকদের নোটিশ দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেসব ভবনে সেটব্যাক ও নির্মাণ বিধিমালা মানা হয়নি, সেগুলো নিয়ম মেনে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হবে।’
বিল ও পুকুর ভরাট করে নির্মিত ভবনগুলোর বিষয়ে একাধিক কর্তৃপক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন বলে জানান পৌর প্রশাসক। তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সহযোগিতা পেলে পৌরসভা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
ইতিহাসও সুনামগঞ্জের জন্য সতর্কবার্তা দেয়। ১৭৯৭ সালে সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্পে সুনামগঞ্জে প্রাণ হারান অন্তত ২৮৭ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সক্রিয় ডাউকি ফল্টের পাশে থাকা এই ভাটি অঞ্চলে নিরাপদ ও পরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। নীতিমালা উপেক্ষা করে জলাশয় ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ চলতে থাকলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পই ডেকে আনতে পারে বড় মানবিক বিপর্যয়।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








