হাকালুকিতে ফিরছে হারানো বনাঞ্চল
শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৩৪ AM

হাকালুকিতে ফিরছে হারানো বনাঞ্চল

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৯/০২/২০২৬ ১২:০২:০৪ PM

হাকালুকিতে ফিরছে হারানো বনাঞ্চল


এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ৫টি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। মিঠাপানির এ হাওর ঘিরে রয়েছে অনেক সম্পদ। জলজ, মৎস্য, কৃষি- এই তিন উপাদানের জন্য একসময় হাওরটি বিখ্যাত থাকলেও বর্তমানে জলজ উদ্ভিদ ছাড়া মৎস্য ও কৃষিতে সাফল্য রয়েছে হাওরটির।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, হাকালুকির আয়তন প্রায় ১৮ হাজার ১৫০ হেক্টর। ছোট-বড় মিলে প্রায় ২৩৬টি বিল রয়েছে এই হাওরে। আছে অসংখ্য খাল, যেগুলোর পানি দিয়ে কৃষকরা সেচের মাধ্যমে কৃষিকাজ করেন। এসব খাল-বিলে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বর্ষা মৌসুমে বিল ও খাল পানিতে একাকার হয়ে যায়। শীতকালে প্রচুর বিদেশি পাখির আগমন ঘটে এই হাওরে। বরফে ঢাকা পশ্চিমা দেশ সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, তিব্বত, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাখিগুলো আসে। এখানে শীত কমে গেলে তারা আবারও তাদের দেশে ফিরে যায়।

বোরো ও আমন চাষের জন্যও হাকালুকি হাওর প্রসিদ্ধ। শীতের কনকনে সময়ে কৃষক ভোরে সূর্য আলো ছড়ানোর সাথে সাথে হাওরে গিয়ে কৃষিকাজ করেন। বর্ষাকালে হাওরের সবটুকু জুড়ে থাকে পানি আর পানি। সেই পানিতে বাস করে হাজার রকমের ছোট-বড় দেশীয় মাছ। বর্ষা মৌসুম চলে গেলে পানি কমে যাওয়ার কারণে মাছগুলো আশ্রয় নেয় ছোট-বড় বিলগুলোতে। এসব বিল ইজারা দিয়ে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে বাংলাদেশ সরকার।

মৎস্য, কৃষি কিংবা অতিথি পাখির জন্য বিখ্যাত হাকালুকিতে একটা সময় বনাঞ্চল ছিল। প্রায় ৩০-৪০ বছর পূর্বে এই হাওরের বনে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ছিল। মেছো বিড়াল (মেছো বাঘ), শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বসবাস ছিল। হাওরের মধ্যে হিজল, করচের বন ছিল পাহাড়ি জঙ্গলের মতো। এসব বনের গাছের নিচে মাছগুলো ডিম দিত, যাতে শিকারীরা সহজে জাল ফেলে পোনা মারতে না পারে।

কিন্তু পরবর্তীতে হাওরগুলো নিলামে দেওয়ায় ইজারাদারেরা এসব বন কেটে ফেলে বিলে কাঁটা হিসেবে ব্যবহার করার কারণে আগের মতো সেই বনাঞ্চল নেই হাওরে। ১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পরও বিভিন্ন অজুহাতে কাটা হয়েছে এসব গাছ। শুধুমাত্র ২০২১ সালে বাঁধ নির্মাণের অজুহাতে এক মালাম বিল থেকে প্রায় বিশ হাজার গাছ কাটা হয়।

তবে আশার কথা হলো, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট নিজস্ব অর্থায়নে হাকালুকি হাওরের বনাঞ্চল পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিগত কয়েক বছরে প্রায় ৫০ হাজার হিজল, করচ ও বরুন গাছ রোপণ ও এসব পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থা থেকে পাহারাদার নিয়োগ দেওয়ার কারণে পূর্বের মতো ইজারাদারেরা সহজে গাছ কাটতে পারেন না।

প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা ও মাছের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এই বনাঞ্চল রক্ষার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। হাওরপাড়ের বাসিন্দা ধীরেন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হাওরে আগে মাছের পাশাপাশি অনেক গাছ ছিল। আমরা মাছ মারতে গেলেও সহজে জাল ফেলা যেত না। কিছুদিন আগে থেকে এসব গাছ রোপণ করার কারণে কিছুটা সৌন্দর্য ফিরে আসছে।

সিএনআরএস'র নব পল্লব প্রকল্পের ফিল্ড ম্যানেজার মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, একটা সময় হাকালুকি হাওরে প্রচুর জলজ গাছ ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বন বিভাগের আওতা থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাওরের ভূমির দায়িত্বে চলে যাওয়ার পর থেকে তদারকির অভাবে গাছ কেটে জমি তৈরি করা হয়েছে। সিএনআরএস'র নব পল্লব প্রকল্পের আওতায় সেই পুরনো বনাঞ্চল ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগে সাফল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবারও জলজ বৃক্ষে হাকালুকি তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে আসাহ করছি।

পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম বলেন, হাকালুকি হাওরে জলজ ও হিজল-করচসহ অনেক বনের বৈচিত্র্যময় গাছপালা ছিল। এগুলো অনেকটাই উজাড় হয়ে গেছে। এখন যারা এই উদ্যোগ নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্ত তখনই এই উদ্যোগ পূর্ণতা পাবে, যখন আগের মতো গাছগুলো দেখা যাবে। এ ছাড়া আর যাতে কোনো দুষ্কৃতকারীরা গাছগুলো কাটতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এটি এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হওয়ায় এখানে হিজল-তমাল জাতীয় জলাভূমি উপযোগী গাছের আধিক্য রয়েছে, যা মাছের প্রজনন ও আশ্রয়স্থল। এটা রক্ষা করা জরুরি।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহি উদ্দিন বলেন, সিএনআরএস যে উদ্যোগটি নিয়েছে সেটি খুবই ভালো। হাকালুকি হাওরের বনাঞ্চল পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া আমাদের সাথে আলাপ করে এসব পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থা থেকে পাহারাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমরাও তাদেরকে সহযোগিতা করছি।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর