মহারণে শেষ হাসি কার?
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৯ PM

মহারণে শেষ হাসি কার?

ক্রীড়া ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯/০৭/২০২৬ ১১:০৮:১৭ AM

মহারণে শেষ হাসি কার?


দীর্ঘ এক মাসের উত্তেজনা, নাটকীয়তা, আবেগ আর রোমাঞ্চের পর অবশেষে পর্দা নামতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসরের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে আজ মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল স্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত রাত ১টায় শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই ফাইনাল।

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি শুধু একটি ফাইনাল নয়; বরং দুই প্রজন্ম, দুই দর্শন এবং দুই মহাদেশের ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। একদিকে বিশ্ব ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ, অন্যদিকে স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামালের নেতৃত্বে নতুন যুগের সূচনার স্বপ্ন। ফলে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফির লড়াইয়ের পাশাপাশি এই ম্যাচকে দেখা হচ্ছে ফুটবলের অতীত ও ভবিষ্যতের প্রতীকী দ্বৈরথ হিসেবেও।

বিশ্বকাপজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের নজর ছিল আর্জেন্টিনা ও স্পেনের দিকে। দুই দলই নিজেদের সামর্থ্য, ধারাবাহিকতা ও মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়ে ফাইনালের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে। এখন তাদের সামনে একটাই লক্ষ্য—বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে বসা।

ইতিহাস গড়ার সামনে আর্জেন্টিনা
কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন দেখছে আর্জেন্টিনা। যদি তারা ফাইনালে জয় পায়, তাহলে ব্রাজিল ও ইতালির পর তৃতীয় দল হিসেবে পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়বে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের চতুর্থ শিরোপাও ঘরে তুলবে আলবিসেলেস্তেরা।

কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনা নিজেদেরকে বিশ্বের অন্যতম সফল দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার আরেকটি বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে আধিপত্য আরও দীর্ঘায়িত করতে চায় দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।

চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার যাত্রা ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। নকআউট পর্বে কেপ ভার্দে, মিশর, সুইজারল্যান্ড এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছে তারা। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ মানসিকতা দেখিয়েছে দলটি। টুর্নামেন্টে তাদের করা ১৯ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে, যা দলটির লড়াকু মানসিকতারই প্রমাণ।

স্পেনের লক্ষ্য নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা
অন্যদিকে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে স্পেন। ইউরো চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপে আসা লা রোহারা পুরো আসরেই খেলেছে দারুণ আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত ফুটবল।

ফাইনালে ওঠার পথে অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম এবং সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে হারিয়েছে স্পেন। পুরো টুর্নামেন্টে তাদের রক্ষণভাগ ছিল প্রায় অভেদ্য। সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে দলটি। বলের দখল ধরে রেখে ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যে ফুটবল দর্শন স্পেনকে একসময় বিশ্বসেরা করেছিল, সেই ধারা এবারও বজায় রেখেছে তারা।

কোচের কৌশল, মাঝমাঠে রদ্রির নেতৃত্ব এবং তরুণদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স স্পেনকে ফাইনালের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদারে পরিণত করেছে।

মেসির শেষ নাকি আরেকটি মহাকাব্য?
ফাইনালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের নাম লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রাণভোমরা। চলতি বিশ্বকাপে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে দলের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগর তিনি।

বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার বড় স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে। কিন্তু সময়কে হার মানিয়ে আরও একবার দলকে ফাইনালে তুলেছেন তিনি। ফুটবলবিশ্বে জোর আলোচনা রয়েছে, এটিই হতে পারে মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।

যদি সেটাই হয়, তাহলে বিদায়বেলায় আরেকটি বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলে নেওয়ার চেয়ে বড় সমাপ্তি আর হতে পারে না। তাই আর্জেন্টিনার কোটি সমর্থকের আশা, বিশ্বকাপ মঞ্চে শেষবারের মতো জাদু দেখাবেন তাদের অধিনায়ক।

ইয়ামালের হাত ধরে নতুন যুগের স্পেন
যেখানে মেসি প্রতিনিধিত্ব করছেন এক যুগের, সেখানে লামিন ইয়ামাল প্রতিনিধিত্ব করছেন ভবিষ্যতের। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন স্পেনের এই তরুণ।

তার গতি, ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা ইতোমধ্যে ফুটবল বিশ্লেষকদের মুগ্ধ করেছে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পর বিশ্বকাপেও নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন ইয়ামাল।

তবে স্পেন শুধু ইয়ামালের দল নয়। মাঝমাঠে রদ্রি, আক্রমণে নিকো উইলিয়ামস এবং রক্ষণে পাউ কুবারসির মতো ফুটবলাররা দলটিকে ভারসাম্যপূর্ণ ও ভয়ংকর প্রতিপক্ষে পরিণত করেছেন।

কৌশলের লড়াইও হবে সমান গুরুত্বপূর্ণ
ফাইনালটি শুধু তারকাদের লড়াই নয়, বরং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও লড়াই। স্পেন বরাবরের মতো বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ সাজাতে চাইবে। তাদের লক্ষ্য থাকবে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা তুলনামূলকভাবে সরাসরি আক্রমণ এবং দ্রুত ট্রানজিশনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে, তেমনি সামনে লাউতারো মার্তিনেজের ফিনিশিংও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে মাঝমাঠে রদ্রি ও মেসির লড়াই ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ হতে যাচ্ছে। স্পেন যদি মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তাহলে আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলতে পারবে। আর মেসি যদি নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে স্পেনের জন্য কাজটি কঠিন হয়ে যাবে।

গোলপোস্টে নির্ভরতার নাম মার্তিনেজ
আর্জেন্টিনার বড় শক্তির একটি হলো গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। বড় ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য পরিচিত এই গোলরক্ষক ইতোমধ্যে বহুবার দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন।বিশেষ করে ম্যাচ যদি টাইব্রেকারে গড়ায়, তাহলে মার্তিনেজের উপস্থিতি আর্জেন্টিনাকে মানসিকভাবে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। অন্যদিকে স্পেনও রক্ষণভাগে দারুণ সংগঠিত। ফলে দুই দলের রক্ষণ ও গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্সও ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মুখোমুখি পরিসংখ্যানে সমতা
ইতিহাসের পাতায় আর্জেন্টিনা ও স্পেনের লড়াই বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখন পর্যন্ত ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। এর মধ্যে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৬ ম্যাচ, স্পেনও জিতেছে ৬ ম্যাচ। বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। ফলে আজকের ফাইনাল শুধু বিশ্বকাপের শিরোপাই নির্ধারণ করবে না, দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের সমতাও ভেঙে দেবে।

অপেক্ষা শুধু শেষ বাঁশির
বিশ্বকাপ ট্রফি শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে—মেসির আর্জেন্টিনার, নাকি ইয়ামালের স্পেনের—সেই উত্তর মিলবে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই ম্যাচ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতে যাচ্ছে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। আর নতুন যুগের সূচনার প্রত্যাশা নিয়ে খেলবে স্পেন। দুই দলের শক্তি, সামর্থ্য, ইতিহাস ও বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় এটি হতে যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ বিশ্বকাপ ফাইনালগুলোর একটি।

এখন অপেক্ষা কেবল শেষ বাঁশির। কারণ তার পরই জানা যাবে, ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন রাজা কে?

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর