জীবন সংগ্রামী মা
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ০১:২৮ AM

জীবন সংগ্রামী মা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২/০৫/২০২৪ ০৭:০১:৪৬ AM

জীবন সংগ্রামী মা


ঠিকমতো কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না সুমি বেগম। চার বছরের সন্তানকে চাচির কাছে রেখেই কাজে ছুটে আসতে হয়েছে তাকে। অন্যদিকে ঝরনা বেগম মোবাইলে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে কি যেন বলেছেন। অপরপ্রান্তকে বুঝাতে চাচ্ছেন, তিনি না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে।

সুমি বেগম ও ঝরনা বেগম পেশায় নির্মাণ শ্রমিক। থাকেন মৌলভীবাজার সদরের একাটুনা ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে।

শহরের শান্তিবাগ এলাকায় তাদের দেখা মেলে। তারা সেখানে একটি নির্মাণাধীন ভবনে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন।

আলাপকালে সুমি বেগম বলেন, ছোট ছেলেকে পাশের ঘরের চাচির কাছে রেখে এসেছি। ওর বাবা ঘরে নেই, কাজে গেছেন। ছেলেটা এখন কি করছে? এই চিন্তায় কাজেও মন বসাতে পারছি না।

ঝরনা বেগম জানান, স্বামী, তিন সন্তান ও শাশুড়ি নিয়ে ছয়জনের পরিবার। দুইদিন ধরে শাশুড়ি অসুস্থ। ছোট মেয়েটারও জ্বর। রিকশাচালক স্বামী আজ ঘর থেকে বের হননি।

তিনি বলেন, একজনের রোজগারে তো সংসার চলে না, তাই আমিও কাজ করি। প্রতিদিন কাজ পাই না, সপ্তাহে এক দুইদিন কাজ পাই। আমি ঘরে গেলে তবেই উনি রিকশা নিয়ে বের হবেন।

জীবন সংগ্রামে লড়াকু যোদ্ধা সুমি বেগম ও ঝরনা বেগমের মতো অনেক শ্রমজীবী মায়েরা সন্তানকে ঘরে রেখে কাজে ছুটতে হয়। কিন্তু ঘরে সন্তানকে রেখেও নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না তারা। প্রতিনিয়ত সন্তানের দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, আর তাতে কাজেও ঘটে ব্যাঘাত। কাজ সঠিক না হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে কথা শুনতে হচ্ছে। একদিকে কাজ, নিজের স্বপ্ন, আরেকদিকে সন্তান। এভাবেই নানা টানাপোড়েনের মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে শ্রমজীবী মায়েদের।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, আমার বন্ধুরা আজ প্রতিষ্ঠিত, তাদের দেখলে একদিকে যেমন খুশি হই, তেমনি নিজের মধ্যে হাহাকারও তৈরি হয়। আমিও তো ওদের মতো আজ কোথাও প্রতিষ্ঠিত হতে পারতাম। বিয়ের পর দুই সন্তানের মা হবার পরে মনে হলো, কে দেখবে সন্তানদের। তাই আর নিজের ক্যারিয়ার গড়া হলো না।

নারী নেত্রী জলি পাল বলেন, জীবন-জীবিকা আর সামাজিক মর্যাদার তাগিদে সংসারে মায়েরা এখন কর্মস্থলে যাচ্ছেন। পুরুষের চেয়ে কোনো অংশেই এখন তারা আর পিছিয়ে নেই, সেটা সবারই জানা। কিন্তু সন্তানকে ঘরে রেখেই তাকে কর্মস্থলে ছুটতে হয়। প্রতিনিয়ত মায়েদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, শঙ্কার কাজ করে; কখনো বা অপরাধবোধও জাগে মনের কোণে।

নারীদের নিয়ে কাজ করছেন সোনিয়া মান্নান। তিনি বলেন, আমাদের নারী সমাজ এগিয়ে চলেছে, তারা সব ধরনের কাজেই নিজেকে সম্পৃক্ত করছেন। পরিবারের স্বচ্ছলতা আনতে সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি কাজ করেই চলেছেন। সংসার করছেন, স্বামী-সন্তানও সামাল দিচ্ছেন। ‘যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে’— অনেক আগে থেকে প্রচলিত এ কথাটি তখনকার প্রেক্ষাপটে কতটুকু প্রযোজ্য ছিল জানি না। কিন্তু এখনকার সমাজে এটি সর্বাংশে সত্য।

সমাজকর্মী ও শিক্ষিকা অপরাজিতা রায় বলেন, দেশে কর্মজীবী মায়ের সংখ্যা যেমন দিনদিন বাড়ছে ঠিক তেমনই একক পরিবারের সংখ্যাও বাড়ছে। আর এই অবস্থায় সবচেয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে সন্তানেরা। তারা কোথায় বা কার কাছে থাকবে, এই উদ্বিগ্নতায় অনেক মা তাদের লক্ষ্য টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। শহরকেন্দ্রিক যৌথ পরিবার নেই বললেই চলে। যৌথ পরিবার হলে কর্মক্ষেত্রে যখন মা চলে যান, তখন পরিবারের সদস্যদের কাছে সন্তানকে রেখে যেত পারতো। কিন্তু এখনকার চিত্র ভিন্ন। ফলে কর্মজীবী মায়েরা সন্তানের কথা মাথায় রেখে কর্মক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়ছেন।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর