দা-বঁটি নিয়ে তখনই ছুটে আসেন নারীরা!
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ১২:৩৬ PM

দা-বঁটি নিয়ে তখনই ছুটে আসেন নারীরা!

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭/১১/২০২৫ ১১:৪৬:৫৯ AM

দা-বঁটি নিয়ে তখনই ছুটে আসেন নারীরা!


তখনই ঘটে প্রতীক্ষার অবসান। তখনই ছুটে আসেন নারীরা! তবে খালি হাতে নয়। তাদের হাতে থাকে দা-বঁটি! মাঝে মাঝে ছুরি এবং কাঁচিও নিয়ে আসেন তারা। বাঙালি নারীদের এরূপ আগমন মারামারি সংক্রান্ত রক্তপাতমূলক কাটাকাটির জন্য নয়। তাহলে কিসের জন্য?

দা-বঁটি শান দেওয়ার জন্য, হ্যাঁ। এখানে দা ধারানোর কথাই বলা হচ্ছে! নারীরা তাদের ব্যবহারকৃত বঁটি, দাগুলো দৈনিক ব্যবহার করতে করতে একসময় তা স্বাভাবিকভাবেই ভোঁতা হয়ে পড়ে। হয়ে পড়ে অব্যবহারযোগ্য। প্রয়োজনীয় জিনিসটি তখন আর তীক্ষ্মভাবে কাটে না। তখনই প্রযোজন পড়ে দা শান দেওয়ার বা দা ধারানোর।

নারীরা কানে পেতে প্রতীক্ষা করতে থাকেন— পাড়া-মহল্লার পথ ধরে কোনো দা-বঁটি শান দেওয়ার ফেরিওয়ালা বা ‘শান মেশিন’ আসেন কি না? সময় গড়িয়ে ফিরে আসে সেই প্রাপ্তির ক্ষণ।

সম্প্রতি চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল শহরের পাড়া-মহল্লায় দা-বঁটি শান দেওয়ার জন্য ফেরি করে বেড়ানো বৃদ্ধ লোকটির নাম লিয়াকত আলী। তার এই ব্যক্তিক্রমী পেশার নাম — ‘শান মেশিন’।

‘শান মেশিন’ হলো এমন একটি যন্ত্র যা দিয়ে দা, বঁটি, ছুরি এবং কাঁচির মতো ধারালো জিনিস ধার দেওয়া হয়। এই মেশিনগুলো সাধারণত প্যাডেল চাপ দিয়ে চালানো হয়। যা সাইকেল বা রিকশার চালানোর মতো এবং এটি বহনযোগ্য। যা ফেরিওয়ালারা বিভিন্ন বাড়িতে ও বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।

লিয়াকত আলী জানান, প্রায় ১০ বছর আগে তিনি হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা থেকে শ্রীমঙ্গলে এসেছিলেন দুটো বাড়তি টাকা আয়ের আশায়। সারাদিন শান দেওয়ার মেশিনটি কাঁধে করে ঘুরে ঘুরে সাত-আটশ’ টাকা আয় হয়। আমার নিজের দৈনিক খরচ আছে ২ থেকে ৩শ টাকা।

‘হ্যান্ডমাইক’ বিষয়ে এই শান-মেশিন ফেরিওয়ালা বলেন, মুখ দিয়ে ফেরি করতে খুব কষ্ট হয়। অনেক জোরে চিৎকার দিয়ে কথা বলতে হতো। কিছু দিন হলো ১২শ টাকা দিয়ে একটা হ্যান্ডমাইক কিনছি। এখন অনেক সুবিধা হয়েছে।

এই ব্যক্তিক্রমী পেশায় তার মতো আরও একজন আছে উল্লেখ করে লিয়াকত আলী বলেন, আমি একা না। আমার মতো আরও একজন এই কাজ করে। বলতে গেলে এই শহরে আমরা দুজনেই আছি। প্রায় সমানই আয়-রোজগার হয় আমাদের।

তার পরিবার সম্পর্কে লিয়াকত আলী কথা প্রসঙ্গে জানান, আমি আগে কৃষি কাজ করতাম। তবে এই কৃষি কাজ করে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তারপর বানিয়াচং ছেড়ে এলাম শ্রীমঙ্গল। আমার তিন ছেলে। তারা সবাই নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাসে দু-একবার বাড়িতে যাই। তখন রোজগারের টাকাটা আমার স্ত্রীর হাতে দিয়ে আসি।

একটি দা-বটি শান দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৩০ থেকে ৪০ টাকায় ভালোভাবে একেকটি দা-বঁটি শান দেই। তবে কেউ কেউ আরো কম টাকায় ফুরালে হালকার ওপর দিয়ে শান দেই।

এ সময়টি একদিন হারিয়ে যাবে! সময় হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এই বৃদ্ধ ফেরিওয়ালাও অনায়াসে হারিয়ে যাবেন। হারিয়ে যাবে তার বিদায়বেলার মায়াবী গান! তখনই বিলুপ্ত হয়ে যাবে ভালোবেসে আগলে রাখা তার এই পেশাটি। কেননা, তার পরবর্তী প্রজন্মের আর কেউই নেই — এ পেশাটিকে আগলে রাখার মতো। নারীরা তাদের ভোঁতা দা-বঁটি শান দিয়ে তীক্ষ্মতায় নতুনভাবে জেগে ওঠার সুযোগ পাবেন না আর।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর