পাখিদের ভালোবাসার ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ০১:৫৫ PM

পাখিদের ভালোবাসার ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০/১১/২০২৫ ১১:১০:৪০ AM

পাখিদের ভালোবাসার ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’


পাখিদের প্রতি ভালোবাসা এখানেই। যারা পাখিকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পাননি। যারা পাখিকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দের স্বাদ পায়নি। কিংবা যারা বিচিত্র পাখিদের বিস্ময়কর ডাকাডাকির মাঝে একটু ‘পাখিময় সময়’ কাটাতে পারেননি—তাদের জন্যই ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’।

পাখিদের এমন ভালোবাসার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বপ্নগুলো যিনি দেখেছিলেন তার নাম জায়েদ আহমেদ চৌধুরী। তিনি বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তারুণ্যদীপ্ত প্রকৃতিময় এক মানুষ। পাখিদের প্রতি এমন গভীর ভালোবাসা থেকেই নিজের ছয় একর জমিতে গড়ে তুলেছেন পাখিদের মিলনমেলার এই সম্পূর্ণ আয়োজন।

মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুর ইউনিয়নের অফিসবাজার রোডের আজমেরু গ্রামে অবস্থিত এই পরম সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার জীবন্ত উপকরণ। ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে কেউ আসতে চাইলে আসতে হবে মৌলভীবাজারের মোকামবাজার। এই স্থানের পাকা সড়ক ধরে ২ কিলোমিটারের আকাবাঁকা পথ পেরুলেই আজমেরু গ্রাম।

বার্ডপার্ক ঘুরে দেখা গেল, দেশি প্রজাতির বৃক্ষ জারুল, হিজল, সাদা ও হলুদ শিমুলসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফুলের গাছ এখানে সৌন্দর্য বিস্তার করে রয়েছে। এছাড়া মূল্যবান পাখিদের মধ্যে রয়েছে ম্যাকাও, কাকাতুয়া, পিজেন্ট, কয়েক প্রজাতির টিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি ও প্রাণী।

শুধু পাখি নয়, প্রাণীদেরও লালন–পালনের বৈধতার ভিত্তিতে এখানে রাখা হয়েছে। যেমন- চিত্রা হরিণ, ময়ূর প্রভৃতি। এখানে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন নানান ভাস্কর্য, কৃত্রিম ঝরনা, রঙিন মাছের পুকুর, বার্ড লার্নিং সেন্টার, ইল্যুশন মিউজিয়াম, কিডস জোন, রেস্তোরাঁ প্রভৃতি।

দেশের মধ্যে এই ব্যতিক্রমী জীবন্ত পাখিপার্ক সম্পর্কে জায়েদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশ-বিদেশে ট্রেভেলিং করতে পছন্দ করি। আমি মালয়েশিয়া গিয়েছিলাম তখন দেখেছিলাম আমার থেকে তাদের অনেক পুয়র কালেকশন (ক্ষুদ্র সংগ্রহ), কিন্তু প্রতিদিন ১৫শ টাকার বিনিময়ে শত শত মানুষ লাইন ধরে এমন বার্ডপার্ক দেখছেন। এরপর আমি থাইল্যান্ড, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে এমন বার্ডপার্ক দেখেছিলাম। তখন আমি চিন্তা করলাম তারা যদি করতে পারে, তাহলে আমার কেন আমার এতো জায়গা থাকা সত্ত্বেও দেশে এমন একটি ব্যতিক্রমী পার্ক করতে পারব না? তখন আমি নানান জাতের কবুতর এবং ককাটিয়েল পাখি পালতাম। এর থেকেই আসলে এই স্বপ্নটার বীজ বপন। তারপর ধীরে ধীরে এই পাখি নির্ভর পার্কটি তৈরি করলাম।

উল্লেখযোগ্য পাখির মধ্যে কি কি রয়েছে—এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ব্ল্যাক সোয়ান (কালো রাজহাঁস) এবং ব্লু গোল্ড ম্যাকাও অনেক দামি পাখি। সহজে পাওয়া যায় না। ব্লু গোল্ড ম্যাকাও এ পাখির একদিনের ছানার দেড় লাখ টাকা। এগুলো প্রি-বুক করে রাখতে হয়। এমনিতে পাওয়া যায় না। সালফার ক্রেস্টেড কাকাতুয়া যেটা এগুলোও এক্সপেন্সিভ (দামী)। এছাড়াও গ্রে পেরট (ধূসর টিয়া) এটি আমি দেশ থেকে সংগ্রহ করেছি।

তিনি আরও বলেন, আমার এখানে কোনো দেশি প্রজাতির পাখি নেই। পাখিদের যে খাবারগুলো দেই, সেই খাবারের টানে সকালে অনেক প্রজাতির দেশি পাখি এমনিতেই চলে আসে। আবার খাবার খেয়ে ওরা নিজেদের মতো ফিরে যায়। আমার এখানের বাবুই পাখিরা তাদের বাসা তৈরি করে আছে। আমরা পাখিদের কোনো ধরনের বিরক্তি দিই না। আমার পুকুরের লাইটে অনেক পোকা আসে এবং সেগুলো মাছ ও পেঁচা জাতীয় নিশাচর পাখিরা এসে খেলে থাকে।

এই ব্যতিক্রমী বার্ডপার্কে পাখীপ্রেমীদের সবান্ধবে আমন্ত্রণ জানিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এখানে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ৩৫০ টাকা। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এখানে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করছি বারবার। শিশুরা কিডজোনে তাদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবে। উপরে কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য রেস্তোরাঁ এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। ষাটটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দিয়ে আমরা বার্ডপার্কের সবান্ধবে আমন্ত্রিত জনশৃঙ্খলাকে রক্ষা করার চেষ্টা করে চলেছি।

পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৭০ এর কাছাকাছি। দুই-তিন ঘণ্টা সময় হাতে নিয়ে এখানে আসতে হবে। তাহলে প্রকৃতির সাথে খুব ভালোভাবে কিছুটা সময় কাটাতে পারবেন বলে জানান জায়েদ আহমেদ চৌধুরী।

সন্ধ্যা নামছে ধীরে। মৃদু কুয়াশাঘের হেমন্তের সন্ধ্যা। হঠাৎ দেখা গেল, একঝাক গো-বক সদলবলে উড়ে গেল নিজেদের নীড়ের দিকে। ইতোমধ্যেই আরও দেশি প্রজাতির পাখিরা উড়ন্ত ডানায় মিলিয়ে দিয়েছে তাদের সাজের মায়া। সেই সাজের মায়ায় বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের এই প্রাকৃতিক মুহূর্তটি তখন পুরোপুরি পাখিময়।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর