হবিগঞ্জের একসময়ের খরস্রোতা ও প্রাণবন্ত খোয়াই নদী বর্তমানে দখল, দূষণ ও চরম অবহেলায় অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। নদী খনন এবং তীর থেকে ময়লা আবর্জনা অপসারণের দাবিতে বুধবার দুপুরে আয়োজিত খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার-এর নৌ-যাত্রা কর্মসূচি থেকে বক্তারা নদীর এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
এসময় খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেলের সভাপতিত্বে নৌ সভা থেকে বক্তারা বলেন, একসময়ের খরস্রোতা খোয়াই নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনসহ নদীকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নদীকে এখন বৃহৎ ডাস্টবিন হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। খোয়াই মুখ এলাকায় বহু বছর ধরে নদী ও তীরে ময়লা আবর্জনা ফেলে নদীর অনেকাংশ ভরাট করে ফেলা হয়েছে। যা থেকে চরম দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ওই এলাকা দিয়ে জেলার তিনটি উপজেলায় যোগাযোগ রয়েছে। চরম দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে।
হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবাল বলেন, জেলার কৃষি, ব্যবসা- বাণিজ্য, যাত্রী, পণ্য পরিবহনে অন্যতম মাধ্যম ছিল খোয়াই। এমনকি পার্শ্ববর্তী জেলার মানুষজনও নদীকে ব্যবহার করতেন। বড় বড় নৌকা চলাচল করতো। কৃষি কাজের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই নদী।
মাঝি ফারুক মিয়া বলেন, আমাদের নৌকা ঘাটটি ছিল পার্শ্ববর্তী গরুবাজার এলাকায়। এক যুগ আগেও সেখানে শত শত যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌকা আসতো। এখন সেগুলো ইতিহাস। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে খোয়াই নদীসহ হবিগঞ্জের সংকটাপূর্ণ নদীসমূহের দখল দূষণের বিরুদ্ধে কাজ করছেন খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল।
তিনি বলেন, সরকার আসে, সরকার যায়। প্রশাসক আসে, প্রশাসক যায়। কিন্তু এখানে খোয়াই নদীর অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণ অব্যাহত থাকায় নদীটিকে আর নদী বলার উপায় নেই। পুরাতন খোয়াই নদী পরিণত হয়েছে ড্রেন বা নালায়। শহরের ময়লা আবর্জনার ভাগার হলো খোয়াই নদী। এছাড়া নদীর মূল অংশ থেকে নির্বিচারে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে নদীটি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হবে এ নদীটি অভিভাবকহীন।
তিনি আরও বলেন, নদীর পরিবেশ দেখভাল করার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নদীর প্রতি অমনোযোগী, উদাসীনতা দূরদর্শিতা, কিংবা অন্য যেকোনো কারণেই হোক নদীগুলো দিন দিন চরম সংকটে পৌঁছেছে। নদীকে ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে। নদী কেন্দ্রিক যে পরিবেশ ও মানবিক সংকর সৃষ্টি হয়েছে সেটি থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরো মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হবে।
হবিগঞ্জের সন্তান ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এর সংগঠক ও সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, দীর্ঘদিনের অনাচার, অবহেলা ও বর্বরতার শিকার খোয়াই নদী। এটি হবিগঞ্জবাসীর জন্য আত্মহত্যার শামীল। খোয়াই নদীর সঙ্গে হবিগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্য এমনকি সভ্যতা জড়িত। এছাড়া এ নদীটি হাওড় ব্যবস্থার অন্যতম অংশ। খোয়াই নদীতে ফেলা পলিথিন প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্য হাওড়ের তলদেশে জমা হচ্ছে। মেঘনা হয়ে এসব প্লাস্টিক বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে চলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় হবিগঞ্জের হাওরের মাছে প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। খোয়াই নদীর দূষণকে কেবল পরিবেশ বা প্রতিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার উপায় নেই; বরং তা জনস্বাস্থ্য ও জীব-বৈচিত্র্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনের প্রয়োগ, জনসচেতনতা ও জন প্রতিরোধ ছাড়া খোয়াই নদী ঠিকে থাকবে না।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি 








