মৌলভীবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের পাশাপাশি নতুন মুখের অংশগ্রহণ, দলীয় অবস্থান ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হিসাব। সব মিলিয়ে প্রতিটি আসনে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণ। ফলে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেমন হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে শুধুমাত্র দলীয় প্রতীক নয়, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কিছু আসনে দলীয় বিভাজন, জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর সম্ভাবনা নির্বাচনি হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জেলার চারটি আসনে ২৪ জন প্রার্থীর দলীয় কৌশল, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, জোট রাজনীতি এবং স্থানীয় ইস্যুগুলোর প্রভাব মিলিয়ে এবারকার ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেমন হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
নির্বাচনি এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, মৌলভীবাজার-১ থেকে মৌলভীবাজার-৪ পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় বিএনপি, ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য, জাতীয় পার্টি, গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্ট, এনসিপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে কৌশলগত প্রচারণা চালাচ্ছেন। কেউ গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও পথসভায় জোর দিচ্ছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। স্থানীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়ন। এসব ইস্যু প্রচারে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই এবার প্রার্থী নির্বাচনে ব্যক্তিগত যোগ্যতা, এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিতে চান। দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব ও কাজের মূল্যায়নও ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
হাওরপারের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, স্বাস্থ্যসেবা আর নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা তাদের বড় সমস্যা। যে প্রার্থী এসব নিয়ে বাস্তব কাজের প্রতিশ্রুতি দেবেন, তাকেই সমর্থন করবেন। আগে দল দেখে ভোট দিতেন, এখন এলাকার উন্নয়ন আর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কেমন, এসব দেখেই ভোট দেবেন।
বছরের পর বছর আমাদের একই সমস্যা, মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা। এবার এমন কাউকে চাই, যিনি নির্বাচনের পরেও আমাদের কথা মনে রাখবেন বলছিলেন, শ্রীমঙ্গলের চা সন্তান রাজেশ ভৌমিক।
কুলাউড়ার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সোহাগ আহমেদ বলেন, অভিজ্ঞতা দরকার, আবার নতুনরা পরিবর্তনের আশা জাগায়। ভোটাররা এখন দুটোই বিচার করছে।
কমলগঞ্জ এলাকার তরুণ ভোটার সুজয় দাশ বলেন, নতুন প্রার্থীরা এলে রাজনীতিতে নতুন আইডিয়া আসে। তবে শুধু নতুন হলেই হবে না, যোগ্যতাও থাকতে হবে।
কে বাস্তবে পাশে থাকবেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে রাজনগরের নারী ভোটার উন্মে হাবিবা বলেন, অভিজ্ঞ নেতাদের কাজের ধারাবাহিকতা আছে, কিন্তু নতুন মুখদের মধ্যে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি দেখছি।
বড়লেখার প্রবীণ ভোটার জহির মিয়া বলেন, অভিজ্ঞ নেতারা এলাকার সমস্যাগুলো ভালো বোঝেন, কিন্তু অনেক সময় নতুন চিন্তার অভাব থাকে। তাই এবার অভিজ্ঞতা আর নতুনত্ব। দুটোর মধ্যে ভারসাম্য দেখতে চাই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দলটি আপাতত এগিয়ে রয়েছে। তবে ভোটারদের একটি অংশ বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধানে থাকায় ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রার্থীরাও আলোচনায় উঠে আসছেন।
সব মিলিয়ে অভিজ্ঞ নেতা ও নতুন মুখের লড়াইয়ে এবারের নির্বাচনি মাঠ হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনার মিশেলে ভিন্নধর্মী। শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে ভোটাররা ঝুঁকবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুয়ায়ী, মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৬ জন। এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন, জাতীয় পার্টির আহমেদ রিয়াজ উদ্দিন, বিএনপির নাসির উদ্দিন আহমেদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী বেলাল আহমদ, জামায়াতের মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের মো. আব্দুন নূর ও গণফ্রন্টের মো. শরিফুল ইসলাম।
মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩ হাজার ২০ জন। এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন, ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল কুদ্দুছ, স্বতন্ত্র প্রার্থী এম জিমিউর রহমান চৌধুরী, নওয়াব আলী আব্বাছ খাঁন ও মো. ফজলুল হক খান, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল মালিক, বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম, জামায়াতের মো. সাহেদ আলী ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী।
মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২১২ জন। এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন, খেলাফত মজলিসের আহমদ বিলাল, কমিউনিস্ট পার্টির জহর লাল দত্ত, বিএনপির নাসের রহমান, জামায়াতের মো. আব্দুল মান্নান।
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮৯২ জন। এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন, এনসিপির প্রীতম দাশ, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ জরিফ হোসেন, বাসদের মো. আবুল হাসান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া, বিএনপির মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী ও খেলাফত মজলিসের শেখ নুরে আলম হামিদী।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 








