পবিত্র কোরআন শুধু জীবন বিধান নয়, বরং হেদায়েত ও প্রজ্ঞার এক অনন্য উৎস। এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এমন সব সত্য ঘটনা যা আমাদের ঈমান, ধৈর্য এবং নৈতিকতার পথ দেখায়। এমনই এক অনুপ্রেরণামূলক আখ্যান হলো কিশোর ও বাদশাহর গল্প। এই কাহিনী শুধু সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন লড়াইকেই ফুটিয়ে তোলে না, বরং চরম বিপদেও আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার এক কালজয়ী শিক্ষা দেয়।
কিশোর ও বাদশাহর সেই বিখ্যাত ঘটনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই কাহিনী বর্ণনা করে বলেন, তোমাদের আগের যুগে এক প্রতাপশালী বাদশাহ ছিলেন। তার অধীনে ছিল এক বৃদ্ধ জাদুকর। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসায় জাদুকর বাদশাহকে বললেন, আমার সময় শেষ হয়ে আসছে। আমাকে এমন একটি মেধাবী ছেলে দিন যাকে আমি জাদুর বিদ্যা শিখিয়ে যেতে পারি।
বাদশাহর নির্দেশে এক কিশোরকে জাদুকরের কাছে পাঠানো হলো। কিশোরটি প্রতিদিন জাদুকরের কাছে যাওয়ার পথে এক খ্রিস্টান পাদ্রীর দেখা পেত। সে তার কথা শুনত এবং অভিভূত হতো। এভাবে কিশোরটি জাদুর পাশাপাশি পাদ্রীর কাছ থেকে একত্ববাদের শিক্ষাও নিতে শুরু করল। এর ফলে জাদুকরের কাছে পৌঁছাতে দেরি হলে তাকে শাস্তি পেতে হতো।
পাদ্রী তাকে অভয় দিয়ে বললেন, যখন ভয় পাবে তখন জাদুকরকে বলবে বাড়ির কাজের চাপে দেরি হয়েছে, আর বাড়িতে বলবে জাদুকর আটকে রেখেছিল।
জাদু বনাম সত্যের পরীক্ষা
একদিন পথে বিশাল এক ভয়ংকর প্রাণীর কারণে মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কিশোরটি মনে মনে বলল, আজই আমি পরীক্ষা করব জাদুকর বড় না কি পাদ্রী। সে একটি পাথর হাতে নিয়ে প্রার্থনা করল, হে আল্লাহ! যদি পাদ্রীর কাজ আপনার কাছে জাদুকরের চেয়ে প্রিয় হয়, তবে এই প্রাণীকে মারার শক্তি দিন যাতে মানুষ রাস্তা পারাপার হতে পারে। সে পাথরটি ছুঁড়তেই অলৌকিকভাবে প্রাণীটি মারা গেল। পাদ্রী সব শুনে বললেন, বাছা! আজ তুমি আমার চেয়েও শ্রেষ্ঠ স্তরে পৌঁছে গেছ। শীঘ্রই তোমার পরীক্ষা শুরু হবে। বিপদে পড়লে আমার নাম প্রকাশ করো না।
অন্ধত্ব জয় ও ঈমানের শক্তি
আল্লাহর নির্দেশে ওই কিশোর অন্ধত্ব ও কুষ্ঠসহ নানা কঠিন রোগ নিরাময় করতে শুরু করল। বাদশাহর এক অন্ধ সভাসদ এই অলৌকিক ক্ষমতার কথা শুনে অনেক উপহার নিয়ে কিশোরের কাছে এলেন এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আকুতি জানালেন।
কিশোরটি বিনীতভাবে বলল, আমি কাউকে সুস্থ করি না। সুস্থ করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আপনি যদি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আনেন, তবে তিনি আপনাকে সুস্থ করে দেবেন। ওই ব্যক্তি ঈমান আনলেন এবং অলৌকিকভাবে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে এল।
বাদশাহর ক্রোধ ও কিশোরের কৌশল
সভাসদের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসা ও আল্লাহর ওপর ঈমান আনার ঘটনায় বাদশাহ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। নির্যাতনের মুখে ওই ব্যক্তি কিশোরের নাম প্রকাশ করতে বাধ্য হন। কিশোরকেও ধরে আনা হয় এবং ধর্ম ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তাকে পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া বা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারার সব চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তা ব্যর্থ হয়।
অবশেষে কিশোর নিজেই বাদশাহকে কৌশল শিখিয়ে দিয়ে বলল, আপনি যদি আমাকে মারতে চান তবে সব মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করুন। এরপর বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম বা এই কিশোরের রবের নামে বলে তীর ছুঁড়ুন।
কোরআনের যে ৪ ঘটনা ঈমান বৃদ্ধি করবে
বাদশাহ ঠিক তা-ই করলেন। তীরের আঘাতে কিশোরের মৃত্যু হলো, কিন্তু উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ সমস্বরে বলে উঠল, আমরা এই কিশোরের রবের ওপর ঈমান আনলাম!
অগ্নিগহ্বর ও আসহাবুল উখদুদ
নিজের পরাজয় দেখে ক্ষিপ্ত বাদশাহ বিশাল পরিখা খনন করে তাতে আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দিলেন। যারা ধর্ম ত্যাগ করবে না তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘোষণা দেওয়া হলো।
কোরআনের সূরা আল-বুরুজে এই ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। বলা হয়েছে, অভিশপ্ত সেই গর্তের অধিপতিরা যখন আগুনের কুণ্ডে বিশ্বাসীদের ফেলছিল, তখন তারা পাশেই বসে তা উপভোগ করছিল। শুধু আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করার অপরাধেই তাদের এই নিষ্ঠুর শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই জালিম বাদশাহর নাম ছিল যুনুওয়াস। তিনি ইয়েমেনের শাসক ছিলেন। প্রায় ২০ হাজার বিশ্বাসীকে তিনি জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছিলেন। এই নৃশংসতার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক ব্যক্তি রোম সম্রাটের সাহায্য চান।
পরবর্তীতে আবিসিনিয়ার (ইথিওপিয়া) খ্রিস্টান রাজা নাজ্জাশির পাঠানো বাহিনীর হাতে যুনুওয়াস পরাজিত ও নিহত হন। এরপর ইয়েমেনে দীর্ঘ ৭০ বছর আবিসিনীয় শাসন বজায় ছিল।
কিশোর ও বাদশাহর এই ঘটনা শুধু অতীতের কোনো গল্প নয়, বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াইয়ের এক জীবন্ত প্রতীক। এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, পার্থিব জয়-পরাজয়ের চেয়ে সত্যের পথে অবিচল থাকাই হলো প্রকৃত সফলতা। যুগে যুগে সত্যের বিজয় এভাবেই নিশ্চিত হয়।
আজকের সিলেট/এপি
ধর্ম ও জীবন ডেস্ক 








