সৃষ্টি তার স্রষ্টার অশেষ রহমতের ধন্য হয়
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৩ AM

রহমতের দশকের দ্বিতীয় দিন

সৃষ্টি তার স্রষ্টার অশেষ রহমতের ধন্য হয়

শাহিদ হাতিমী

প্রকাশিত: ১৩/০৩/২০২৪ ১২:০৩:৪৯ PM

সৃষ্টি তার স্রষ্টার অশেষ রহমতের ধন্য হয়


প্রথম ইফতারের প্রস্তুতিই আলাদা। অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে গতকাল পহেলা রোজা ও প্রথম ইফতারের মাধ্যমে মুমিনরা রোজাকে বরণ করেছেন। আজ বুধবার, ১৪৪৫ হিজরীর দ্বিতীয় রামজান, রহমতের দশকের দ্বিতীয় দিন।

মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সা. বলেছেন, ‘রামজান মাস শুরু হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক অনবরত ঘোষণা করতে থাকে, হে সৎকর্মপরায়ণ! তুমি দ্রুত অগ্রসর হও। আর হে পাপাচারী! তুমি নিবৃত্ত হও।’ (তিরমিজি)

পবিত্র রমজানের আজ দ্বিতীয় দিন। এ মাসে আল্লাহ তায়ালার রহমত অফুরন্ত রহমত বর্ষণ হয়। এ মাসে আল্লাহর সব সৃষ্টি তাঁর অশেষ রহমতের দ্বারা ধন্য হয়। মহানবী সা. বলেছেন, এটি এমন একটি মাস, যার প্রথম ভাগে আল্লাহর রহমত, মধ্যভাগে গুনাহের মাগফেরাত এবং শেষ ভাগে দোজখের আগুন থেকে মুক্তিলাভ রয়েছে’। (মেশকাত)

এখন রাত গভীর হলে মসজিদের মাইকে কী চমৎকারভাবে ঘোষণা হয়- মাহে রামাজান/ জেগে ওঠো মুসলমান! রামজানে সেহরির সময়ের এমন ডাকাডাকি আর কোনো মাসে হয় না।

গতকাল উল্লেখ হয়েছে, বছরে ১২টি মাসে রামজান হল পৃথিবীর প্রতিটি মুসলমানের নিকট উৎসবের মাস। পবিত্র কুরআনে এই রামাজান মাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বলেছেন : রামাজান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য দিশারী এবং এতে পথনির্দেশ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাসে (স্বস্থানে) উপস্থিত থাকবে, সে যেন রোযা রাখে (সূরা বাকারা : ১৮৫) ।

এ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর কাছে এ মাসের অসামান্য মর্যাদা রয়েছে। যেমনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই বলেন- ‘রোযা আমার জন্যে রাখা হয় এবং আমিই তার প্রতিদান দেবো।’ 

পরকালে যে তিনি কী পুরস্কার দেবেন তার কিছুটা ইঙ্গিত নবী কারিম সা. আমাদের দিয়েছেন। সে থেকে রোযাদারগণ নিশ্চয়ই পরিতৃপ্ত হবার আনন্দ পাবেন।

রাসূলে খোদা বলেছেন, ‘রমযান এমন একটি মাস, যে মাসে আল্লাহ তোমাদের জন্যে রোযা রাখাকে ফরজ করে দিয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি ঈমানসহকারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রোযা রাখবে, তার জন্যে রোযার সেই দিনটি হবে এমন, যেন সবেমাত্র সে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে। অর্থাৎ রোযাদার তার সকল গুণাহ থেকে মুক্তি পেয়ে নিষ্পাপ শিশুটির মতো হয়ে যাবে।

রামজানের প্রথম দশদিন রহমতের হিসাবে পরিগণিত। নবী করিম (সা.) মাহে রমজানকে রহমত, বরকত ও কল্যাণের মাস বলে আখ্যায়িত করেছেন। রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর বিশেষ রহমতে পরিপূর্ণ। ঝরণাধারার মতো আল্লাহর আশিষধারা রোজাদারদের অন্তররাজ্যে লোকদৃষ্টির অলক্ষ্যে বর্ষিত হতে থাকে। রমজান মাস এমন একটি মাস, যার প্রথম ১০ দিন রহমতে পরিপূর্ণ, দ্বিতীয় ১০ দিন ক্ষমা ও মাগফিরাতে পরিপূর্ণ এবং শেষ ১০ দিন জাহান্নামের শাস্তি থেকে নাজাত ও মুক্তির জন্য নির্ধারিত।

রোজা পালনের মধ্য দিয়ে মুমিন বান্দারা আত্মিকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। তাই আল্লাহ তায়ালা রামজান মাসে তাঁর রহমতের দরজা অবারিত করে দেন।

নবী করিম সা. বলেছেন, ‘রামজান মাসে আমার উম্মতকে পাঁচটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা আমার পূর্ববর্তী কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।

  • রমজানের প্রথম রাতে আল্লাহ তাদের দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন, আর আল্লাহ যার দিকে দৃষ্টি দেন, তাকে কখনো শাস্তি প্রদান করেন না।
  • সন্ধ্যার সময় তাদের মুখ থেকে যে গন্ধ বের হয়, তা আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম।
  • প্রত্যেক দিনে ও রাতে ফেরেশতারা রোজাদারদের জন্য দোয়া করেন।
  • আল্লাহ তাআলা তাঁর বেহেশতকে বলেন, ‘তুমি আমার বান্দার জন্য সুসজ্জিত ও প্রস্তুত হও! আমার বান্দারা অচিরেই দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট থেকে অব্যাহতি পেয়ে আমার বাড়িতে ও আমার সম্মানজনক আশ্রয়ে এসে বিশ্রাম নেবে।’
  • রমজানের শেষ রাতে আল্লাহ তাদের সব গুনাহ মাফ করে দেন।’ এক ব্যক্তি বলল, ‘এটা কি লাইলাতুল কদর?’ রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, ‘না, তুমি দেখোনি শ্রমিকেরা যখন কাজ শেষ করে, তখনই পারিশ্রমিক পায়?’ (বায়হাকী)

বান্দার কৃত অপরাধগুলো ক্ষমা করার জন্য পরম করুণাময় আল্লাহ রামজান মাসকে বিশেষ রহমত হিসেবে প্রতিবছর পাঠিয়ে দেন, যাতে তারা স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করে ধন্য হতে পারে। যারা অপরিণামদর্শী, তারা এসবের খুব একটা গুরুত্ব দেয় না, বিভিন্ন অজুহাতে রোজা রাখে না, অশালীনতা, বেহায়াপনা ও প্রকাশ্যে পানাহার করে- এসব অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য কাজ। মুসলমানরা মাহে রমজানকে নিজের জীবন নিষ্পাপ পুণ্যময় করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে।

তাই দেখা যায়, মুসলিম সমাজের ঘরে ঘরে রামজানের সমাদর, রমজানের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার বিভিন্ন আয়োজন, এ মাসের মাহাত্ম্য, ফযিলত ও বরকত অর্জনের জন্য নানা আমল ও কর্মসূচি। সোনালি যুগের মুসলমানরা এ মাসকে যথাযথ ভাবগম্ভীর পরিবেশে অতিবাহিত করার জন্য রজব মাস থেকে প্রস্তুতি নিতেন এবং তাঁরা রজব থেকে মাহে রমজান পর্যন্ত পুণ্য অর্জনের যে অবারিত ধারা প্রবাহিত হয় তা পাওয়ার জন্য খোদাতায়ালার কাছে ফরিয়াদ করতেন।

আমরা আশা করি, রমজানে ত্যাগ ও সংযমের চর্চায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনও আলোকিত হবে। কেবল ব্যক্তিগত ত্যাগ ও সংযম নয়; রমজানের অবশ্য কর্তব্যগুলো পালনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানের সঙ্গে যে যোগসূত্র নবায়ন করে নেয়, তার সামষ্টিক তাৎপর্যও ব্যাপক। রোজার মাধ্যমে শুধু পান, আহার ও জৈবিক চাহিদা বর্জনই নয়; আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য অন্তরের লোভ-লালসা ও নেতিবাচক চিন্তার লাগাম টেনে ধরতে হয়। রোজা অনুভব করায় ক্ষুধার্ত ও বঞ্চিত মানুষের কষ্ট। মহান আল্লাহ আমাদেরকে রামাজানের শিক্ষাকে কাজে লাগানোসহ এ মাসের পবিত্রতা রক্ষায় সুমতি দিন। (চলবে)

লেখক : সিনিয়র সহ সম্পাদক, আজকের সিলেট ডটকম।

সিলেটজুড়ে


মহানগর