আজ ৩য় রামজান। বর্ণিত হয়েছে- ১লা রামজানে রোজাদারকে নবজাতকের মত নিষ্পাপ করে দেয়া হয়। ২য় রামজানে রোজাদারের মা-বাবাকে মাফ করে দেয়া হয়। ৩য় রামজানে- একজন ফেরেশতা ইফতারের আগে রোজাদারের ক্ষমার ঘোষণা দেন। রহমতের দশক থেকে গত হয়েছে দুটি রোজা। মুসলিম বিশ্বে ইফতারের গুরুত্ব অত্যন্ত ছান্দিক।
বাহারী আয়োজনে আর ইফতারের সুঘ্রাণে মোহিত হয়ে ওঠে চারিপাশ। শহরের জন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসেছে নানান আইটেমের পসরা-ব্যবসা। আমরা ইফতারির খাবার নিয়ে বসি, কিন্তু আজান বা সময় না হলে মুখে দেইনা কিছু। এভাবে তাকওয়ার জানান হয়। এতে মহান আল্লাহ অনেক খুশি হন, প্রতিদিন ইফতারের সুঘ্রাণে ক্ষমার ঘোষণা পান অসংখ্য মুসলমান। বিশ্বের আনাচে-কানাচে চলছে রামজানের কলরব। অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে বইছে ইবাদত-বন্দেগীর সমীরণ।
রমজানে মানবতার দিশারী হিসেবে কোরআন নাজিল হওয়ায় মাসটির গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। এই মাসে যে কদরের রজনী আছে, সেই রাতকে আল্লাহ তাআলা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে ঘোষণা করেন। এ ছাড়া রোজা রাখার পাশাপাশি সমাজে উঁচুনিচুর বৈষম্য দূর করতে চেষ্টা করতে হবে। আমরা সমাজে যারা বিত্তবান, ধনীক শ্রেণির লোকেরা আছি তাদের কিছু সামাজিক দায়িত্ব আছে। এই মাসে আমাদের প্রতিবেশী গরীব লোকদের সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য সহযোগিতা করতে হবে এবং তাদের খোঁজ খবর রাখতে হবে। আমরা রোজা রাখলাম কিন্তু আমার প্রতিবেশিরা কষ্টে রোজা রাখতে পারছে না তাহলে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব পালন প্রশ্নবিদ্ধ থেকে গেলো।
আমাদের মহানবী সা. বলেছেন- ‘যার প্রতিবেশী ক্ষুধার্থ অবস্থায় জীবন যাপন করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ তাই আমাদের সাধ্য অনুযায়ী আমরা আমাদের প্রতিবেশী, গরীব, বস্ত্রহীন লোকদের সাহায্য করে উঁচুনিচুর বৈষম্য দূর করে এ মাসের মান রক্ষা করতে স্বচেষ্ট হতে হবে। রোজার ফজিলত যেমন রয়েছে তেমনি কোন মুসলমানের উপর রোজা ফরজ হওয়া সত্তেও যদি রোজা না রাখে তার জন্য রয়েছে কঠিনতর শাস্তির ঘোষণা।
রামজানুল মোবারক উপলক্ষে কুরআন ও হাদিসে যে সব বাণী এসেছে তা সত্যিই একজন মুমিনকে সৎ জীবন রচনার এক দুর্দমনীয় প্রতিযোগিতায় উদ্বেলিত করে।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন- শাহরু রামাজানাল লাযী উনযিলা ফীহিল কুরআন, হুদাললিন্নাসি ওয়া বায়্যিনাতিম মিনাল হুদা ওয়াল ফুরকান।’ অর্থাৎ ‘রামজান মাস হলো সেই মাস- যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।
কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসে রোজা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্যদিনে গণনা পূর্ণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না- যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হিদায়াত দান করার দরুন আল্লাহতায়ালার মাহাত্ম্য বর্ণনা কর, (আর) যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।’
এর পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে : ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করে আমার ব্যাপারে; বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে তাদের প্রার্থনা কবুল করে নিয়ে থাকি, যখন (তারা) আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য, যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। -(সূরা বাকারাঃ ১৮৫,১৮৬)।
উপরোক্ত আয়াত দুটোর প্রথমটিতে রামজান মাসকে অন্য এগারোটি মাস থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যে তুলে ধরা হয়েছে এবং এ মাসকে কুরআনের মাস হিসেবে আখ্যায়িত করে এরমধ্যে সুনির্দিষ্ট করণীয় বিবৃত হয়েছে। এ মাসকে প্রকৃত হিদায়াত ও পথপ্রাপ্তির মোক্ষম মৌসুম বলেও এখানে ইশারা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহতায়ালার দরবারে ইবাদত বন্দেগি ও প্রার্থনার গুরুত্ব এবং এসব ব্যাপারে আন্তরিক বিশ্বাসের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। আয়াতের মর্মার্থ দ্বারা বোঝা যায়, রামজান মুসলিম জিন্দেগিতে একটি ট্রেনিং পিরিয়ড এবং এ থেকে ফায়দামন্দ হওয়ার জন্য প্রয়োজন প্রচন্ড ইখলাস, আন্তরিকতা ও সুষ্ঠু পরিবেশ। হাদিস শরীফেও বার বার এ মাসকে প্রথম থেকেই অনুধাবন ও সদ্ব্যবহার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।
আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে কোরআন হাদিসের আলোকে রামজানুল মোবারক গ্রহণ করার এবং এর বরকত লাভের জন্য পরিবেশ প্রতিবেশ কাজে লাগানোর তাওফিক দিন। (চলবে)
লেখক : সিনিয়র সহ সম্পাদক, আজকের সিলেট ডটকম।
শাহিদ হাতিমী 








