হবিগঞ্জে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও আত্মীয়স্বজনের বাড়ি ছেড়ে অনেকেই ফিরছেন নিজ নিজ ঘরে। কিন্তু ফিরে ভাঙা ঘর, কাদায় ভরা উঠান এবং পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র ও খাদ্যসামগ্রী দেখে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। অনেকের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, নেই ঘর পুনর্নির্মাণের সামর্থ্য।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের হাতিরথান গ্রামের বিধবা রানু বেগম তাদেরই একজন। স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়ের একটি কোম্পানির চাকরির সামান্য আয়েই চলত পরিবারের চার সদস্যের সংসার। শুক্রবার রাতে বন্যার তীব্র স্রোতে তাদের একমাত্র কুঁড়েঘরটি ধসে পড়ে। এখন তারা পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
রানু বেগম বলেন, "চোখের সামনে ঘরটা ভেঙে পড়ল। কিছুই বের করতে পারিনি। কাপড়চোপড়, চাল-ডাল, বিছানাপত্র—সব নষ্ট হয়ে গেছে। মেয়ের সামান্য আয়ে সংসার চলে। এখন নতুন ঘর তুলব কীভাবে?"
একই গ্রামের আমেনা খাতুনের ঘরও বন্যায় ধসে গেছে। তিনি বলেন, "মাথা গোঁজার জায়গাটুকুও নেই। মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাই। ঘর তোলার সামর্থ্য নেই। সরকার সহায়তা না দিলে খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হবে।"
শুধু হাতিরথান নয়, কালীগঞ্জ, চরহামুয়াসহ বন্যাকবলিত বিভিন্ন গ্রামের চিত্র প্রায় একই। কোথাও ঘর ধসে পড়েছে, কোথাও কাদায় ভরে গেছে বসতভিটা। অনেক পরিবার এখনও ঘরবাড়ি পরিষ্কার করছেন। কেউ ভেজা কাপড় শুকাচ্ছেন, কেউ আবার নষ্ট হয়ে যাওয়া খাদ্যসামগ্রী ও আসবাবপত্র সরিয়ে ফেলছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন। রাতেই অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র, উঁচু স্থান বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেয়।
এর আগে শনিবার থেকে পানি কমতে শুরু করলে মানুষ ঘরে ফিরতে থাকেন। তবে ফিরে দেখেন, আসবাবপত্র, বিছানাপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রায় সবকিছুই পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষকের গবাদিপশুর খাদ্যও নষ্ট হওয়ায় নতুন সংকট দেখা দিয়েছে।
এখনো নিচু এলাকার অনেক স্থানে কোমরসমান পানি রয়েছে। অনেক কাঁচা ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে থাকায় যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে অনেক পরিবার এখনো বাড়ি ফিরতে পারেনি।
চরহামুয়া গ্রামের বাসিন্দা বদরুল আলম বলেন, "বাঁধ ভাঙার আধা ঘণ্টার মধ্যেই পুরো এলাকা তলিয়ে যায়। ঘরের কোনো জিনিসই রক্ষা করতে পারিনি।"
হাতিরথান এলাকার ফাহিম রহমানের অভিযোগ, দুই দিন ধরে অনেক মানুষ ঠিকমতো খাবার পাননি। কিন্তু এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণসহায়তা পৌঁছায়নি।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে। পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তা বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।
বন্যার পানি কমলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, খাদ্যসংস্থান এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা। স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে তাদের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হবে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি 








