হাকালুকি হাওর। আমাদের দেশের সর্ববৃহৎ এ হাওরের একটি অংশ সিলেট জেলায় ও আরেকটি অংশ মৌলভীবাজার জেলায় বিস্তৃত। অপরদিকে, বাংলাদেশের প্রধান চারটি ‘মাদার ফিসারিজ’র মধ্যে হাকালুকি হাওর অন্যতম। এছাড়া এ হাওরের বুকে বেশ কিছু জায়গাজুড়ে রয়েছে জলজ উদ্ভিদ হিজল, করচ ও বরুণ বন। এরই সাথে সেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বন্য প্রাণীর আবাসও। অথচ স্থানীয় কিছু সুবিধাভোগী লোকের লোভের ফলে ক্রমশ হুমকির মুখে পড়েছে হাওরের মধ্যে থাকা বনের জীববৈচিত্র্য।
স্থানীয়রা এরইমধ্যে বনের একাংশের গাছপালা কেটে সাবাড় করেছেন, করছেন সরিষার আবাদ। এছাড়া সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং গরু-মহিষের অবাধ বিচরণও হাওরের জীববৈচিত্র ধ্বংসের অন্যতম কারণ।
বন বিভাগ ও মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ভৌগলিক কারণে হাকালুকি হাওরে প্রতি বছর উজান থেকে পাহাড়ি ঢল আসে। ভারতের মেঘালয় পাহাড়, আসাম ও মণিপুর পাহাড় এবং ত্রিপুরা ও মিজোরাম পাহাড়ের নেমে আসা ঢলে হাকালুকি হাওর প্লাবিত হয়। এসময় ছোট, মাঝারি ও বড় ২৭৬টি বিল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে একটি বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। ওই সময় হাকালুকি হাওরের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ১৮১১৫ হেক্টর, আর শুষ্ক মৌসুমে (পানি শুকিয়ে গেলে) শুধুমাত্র বিলের আয়তন হয় প্রায় ৪৯২৫ হেক্টর। হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা (৪০%), কুলাউড়া ও জুড়ী (৩০%) এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ (১৫%), গোলাপগঞ্জ (১০%) এবং বিয়ানীবাজার (৫%) অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত।
এই হাওরাঞ্চলকে ঘিরে প্রায় ১লক্ষ ৯হাজার মানুষের বসবাস। হাকালুকি হাওরের মৎস্য সম্পদ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের প্রধান চারটি ‘মাদার ফিসারিজ’ এর মধ্যে হাকালুকি হাওর অন্যতম।
হাওরপাড়ের স্থানীয়রা জানান, বিভিন্নভাবে এই বনকে ধ্বংস করা হচ্ছে। বনের বড় বড় গাছগুলো কেটে নিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বন বিভাগের কোন লোক তা দেখাশুনা করেন না। আর যদিও বা দেখেন বলেন না কোন কথা।
তারা বলেন, এরই মধ্যে দুর্বৃত্তরা বনের ২০-২৫ একর জায়গার গাছপালা কেটে ফেলেছে। এমনকি গাছের শেকড়ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। ফাঁকা হওয়া কিছু জায়গায় সরিষার বীজ রোপণ করা হয়েছে।
বনের পাহারাদার মাতাব উদ্দিন ও মখলিছ আলী জানান, গাছ কাটার সময় তারা বাধা দিলে দুর্বৃত্তরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। তবে সেখানে পুলিশ যাওয়ার পর থেকে গাছ কাটা আপাতত বন্ধ আছে। কাটা গাছগুলো কোথায় যাচ্ছে জানতে চাইলে তারা বলেন, দুর্বৃত্তরা ও স্থানীয় কিছু লোক গাছগুলো কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যায়।
এদিকে, হাওরপাড়ের স্থানীয় লোকজন জানান, বনের গাছপালা বর্ষায় হাওরের ঢেউ ঠেকায়, যার ফলে তীরবর্তী বাড়িঘর-রাস্তাঘাট রক্ষা পায়। বর্ষা মৌসুমে মাছের খাদ্য ও আবাসস্থল হয়, বনের ভেতরে বন্য প্রাণী ও পাখি আশ্রয় নিয়ে থাকে।
বিভিন্ন মাছের খাবার হাওরের কিছু জলজ উদ্ভিদ। মিঠা পানির সকল প্রজাতির ছোট-বড় সুস্বাদু মাছ, অতিথি ও দেশীয় পাখি, নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, গুল্মলতা, নলখাগড়া ইত্যাদিতে ভরপুর ছিল হাকালুকি হাওর। পাওয়া যেত নানা জাতের ঔষধি লতাপাতা। বর্তমানে এ সবের অনেক কিছু হাকালুকিতে দেখো যায় না।
হাকালুকির বনের ভিতরে রয়ে যাওয়া গাছগুলোর উচ্চতার ছয়-সাত ফুট হবে। এর মধ্যে ২০-২৫ একর জায়গা গাছপালাশূন্য। সেখানে মাটি খুঁড়ে গাছের শেকড় উপড়ে ফেলা হয়েছে। ফাঁকা হওয়া কিছু জায়গায় মৌসুমকালে সরিষার বীজ রোপণ করা হয়।
হাকালুকি হাওরপাড়ের প্রবীণ লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় নানা প্রজাতির জলীয় উদ্ভিদ ও গুল্মলতায় ভরাট প্রতিটি বিল। শীতকালে প্রতিটি বিল সিংরা, (স্থানীয় ভাবে যাকে ‘হিংগাইর’ বলা হয়), পানি ফল (অর্থাৎ উফল), এরালী, শেওলা ইত্যাদি নানা প্রজাতির গুল্মলতায় ভরপুর থাকত।
হাওরের সাথে সম্পৃক্ত পরিবেশ কর্মী কবির আহমদ জানান, এরই মধ্যে গাছ কাটার বিষয়টি প্রশাসন, বন বিভাগ ও পুলিশের কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। তাদের জানানোর পরও কেউ রক্ষায় এগিয়ে আসছে না। তিনি বলেন, গোপনে গাছ কাটা ও বনের ভিতর গরু-মহিষের অবাধ বিচরণে এখন বন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি









