ঢাকা থেকে: সিলেটসহ ৬৪ জেলায় চলছে "বাংলা ব্লকেড" কর্মসূচি। প্লেকার্ড হাতে আর নানান চমকদার স্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তপ্ত হয়ে ওঠছে সারাদেশের রাজপথ। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে তীব্র আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা কোটা বাতিল-সহ চার দফা দাবিতে সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ নামক কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন পালন করছেন আজ। কোটাবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে
মঙ্গলবার দেশব্যাপী গণসংযোগ এবং ছাত্র ধর্মঘট পালনের পর আজ আবারো সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
বুধবার রাজধানীসহ সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা এ কর্মসূচি পালন করবেন কোটাবিরোধীরা। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়।
জানা যায়, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সে সময় কোটা পদ্ধতি বাতিল করে সরকার। পরে ২০২১ সালে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হাইকোর্টে রিট করলে গত ৫ জুন (২০২৪) এক রায়ের মাধ্যমে আবারও ফিরে আসে কোটা ব্যবস্থা।
এ বিষয়ে গত রোববার সচিবালয়ের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “শিক্ষার্থীরা যে ইস্যুতে আন্দোলন করছে, সেটা তো সরকারি সিদ্ধান্ত। আদালত ভিন্ন রায় দিয়েছেন। আমরা তো সিদ্ধান্ত দিইনি, দিয়েছেন আদালত।’’
এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে যদি আদালতের এই রায় বহাল থাকে তাহলে শিক্ষার্থীরা কী করবেন?
জবাবে কোটা সংস্কার আন্দোলনে জাবির অন্যতম সংগঠক তৌহিদ সিয়াম বলেন, "২০১৮ সালে ছাত্রদের আন্দোলন হয়েছিল কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু সরকার সেটি বাতিল করেছে, তাই সেই সংকট জিইয়ে রাখা হয়েছে।
কোটাবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের পরিপত্র যদি ফিরে আসে, সে ক্ষেত্রে কোটা নিয়ে আবার ঝামেলা হতে পারে। তাই, আমরা সরকার ও নির্বাহী বিভাগের কাছে সম্পূর্ণ সমাধান চাই। আমাদের ‘বাংলা ব্লকেড’আজ থেকে সারা দেশের ৬৪ জেলায় চলবে। আজ বুধবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরোধ চলবে। সড়ক ও রেলপথও এ অবরোধের আওতায় থাকবে। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম আজকের সিলেট ডটকমকে বলেন, যদি সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে কমিশন গঠনের মাধ্যমে আমাদের দাবি মেনে নেয়, সে ক্ষেত্রেই আমরা রাজপথ ছেড়ে ক্লাসরুমে ফিরে যাবো।
এদিকে সকাল ১০টা হতে না হতেই কোটা বাতিলের দাবিতে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেছে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। হাইকোর্ট কর্তৃক প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের আদেশের বিরুদ্ধে এবং ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে আজ ৫ম দিনের মতো আন্দোলনে নেমেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এ সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের রাস্তার দুই পাশ অবরোধ করে আন্দোলন চালিয়েছেন। এ সময়- কোটা না মেধা- মেধা মেধা’, ‘সংবিধানের মূল কথা-সুযোগের সমতা’, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়-বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়- বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-কোটা প্রথা মানে না’ ইত্যাদি স্লোগানে অবরোধ কর্মসূচি মুখরিত হয়ে উঠে। আলাপকালে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা আজকের সিলেট ডটকমকে জানান, কেন স্বাধীন বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কোটা নিয়ে বৈষম্যের স্বীকার হবে? প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ যদি কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় মেধাবী শিক্ষার্থীরা কী করবে? শিক্ষার্থীদের পক্ষে এমন অবহেলা এবং বৈষম্য মেনে নেওয়া সম্ভব না।
কী আছে শিক্ষার্থীদের চার দফায়? ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটা সংস্কারের দাবিতে বড় বিক্ষোভ হয়। কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছিলেন তখনকার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। কিন্তু তখন সরকারি চাকরিতে (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে) কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
২০২১ সালে সেই পরিপত্রের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের অংশটিকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। সেই রিটের রায়ে চলতি বছরের ৫ জুন পরিপত্রের ওই অংশ অবৈধ ঘোষণা করেন আদালত।
পরে এই রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু গত ৯ জুন প্রাথমিক শুনানির পর আবেদনটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠানো হয়। এই অবস্থায় কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা গত পহেলা জুলাই থেকে যে আন্দোলনে নেমেছে সেখানে চারটি সুর্নিদিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হল :
১) ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখা।
২) পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠনপূর্বক দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরির সমস্ত গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দেওয়া (সুবিধা বঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী ছাড়া)।
৩) সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া।
৪) সর্বশেষ দাবি হচ্ছে, 'দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র' নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আজকের সিলেট/ডি/এপি
শাহিদ হাতিমী 








