শতবর্ষী বাজারটি এখনও বহন করে ঐতিহ্যের সাক্ষ্য। একসময় এই হাট ছিল এলাকার প্রাণকেন্দ্র— সপ্তাহে দুইদিন হাটবারে জমজমাট হয়ে ওঠে বারোয়ারি পণ্যে। আজও সেই হাট টিকে আছে আপন মহিমায়। সময় বদলালেও হারিয়ে যায়নি মানুষের আনাগোনা, কমেনি ব্যস্ততা। শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও হাটবারে জমে ওঠে পুরোনো দিনের সেই চেনা চিত্র। এখনও আছে জৌলুস আছে, কোলাহলও আছে, আছে মানুষের ভালোবাসা।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সরকার বাজারেই অবস্থিত শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী হাট। বারোয়ারি পণ্যে জমজমাট এই হাটে দেখা মেলে মূলত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং প্রায় হারিয়ে যাওয়া বাঁশ-বেতের তৈরি হস্তশিল্পের। এই হাটটি এখনও ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য— লোকজ জীবনের সহজ-সরল রূপ, মানুষের আনাগোনা আর প্রাণের স্পন্দন।
বৃহস্পতিবার ও রোববার সরকার বাজারের সাপ্তাহিক হাটবার। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের ব্যস্ততা ও হাটের আকর্ষণ। এখন রবিবারের হাট আগের মতো জমে না। প্রকৃত জমজমাট বাজারটি হয় বৃহস্পতিবারেই।
ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সরকার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকা পার হয়ে কিছুটা উত্তরে গিয়ে দেখা মেলে সেই হাটের।
হাটের বিশাল অংশজুড়ে নানা আকার ও রঙের গরুর উপস্থিতি চোখে পড়ে। কেনাকাটা চলছে। গরু নিয়ে কেউ হাট আসছেন, কেউ বেরিয়ে যাচ্ছেন। একপাশে ছাগল ও দেশি হাঁস-মুরগি নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। এখানেও কেনাকাটা চলছে। লোকজন আসছেন, দরদাম করছেন। কেউ কিছু কিনছেন, কেউ কেউ ঘুরে দেখছেন।
পারিবারিক একটি অনুষ্ঠানের জন্য দেশি মুরগি কিনতে এসেছেন প্রবাসী সুহেল আহমদ। তিনি বলেন, শহরে দেশি মুরগি পাওয়া যায় না। শুনেছি এখানে গৃহস্থরা তাদের পালিত দেশি মুরগি বিক্রি করেন। তাই কিনতে এলাম।
এদিকে হাটের পূর্ব দিকে কয়েকজন বিক্রেতা বসেছেন বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য নিয়ে। যেখানে রয়েছে মাছ ধরার বিভিন্ন রকম ফাঁদ, কিছু গৃহস্থ কাজে ব্যবহারের পণ্য, কিছু কৃষি উপকরণ।
এখানে কথা হয় প্রবীণ শিক্ষক মো. আজিরউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, এই বেতের তৈরি অনেক পণ্য একটা সময় চাল-ডাল, মাছ-মাংস, শাকসবজি ধোয়াসহ বিভিন্ন কাজের জন্য প্রতিটি ঘরেই অপরিহার্য ছিল। এখনও তা প্রয়োজনীয়, তবে দিন বদলেছে। আগে ছিল বাঁশ-বেতের, এখন তা প্লাস্টিকের তৈরি।
এই হাটে সুখেন্দু সরকারসহ আরও ৭-৮ জন বিক্রেতা বাঁশ-বেতের তৈরি মাছ ধরার ফাঁদ নিয়ে বসেছেন। তারা জানান, মাছ ধরার ফাঁদগুলো সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বসনি, উকা, ডরি, পলো ইত্যাদি নামে পরিচিত। নদী-খাল-বিলসহ বর্ষার পানি প্রবেশ করে এমন সব এলাকার মানুষ বর্ষার এই সময়টায় ব্যস্ত থাকেন মাছ ধরা নিয়ে। আর মাছ ধরার অন্যতম এই ফাঁদ বিক্রিও বেড়ে যায় এ মৌসুমে।
মাছ ধরার ফাঁদ বিক্রেতা সুখেন্দু সরকার বলেন, নিজের হাতের তৈরি ডরি ও বসনি বানিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার হাটে আসেন। পাঁচ-ছয়টা ফাঁদ বিক্রি হয়। আকার অনুযায়ী এক একটা ফাঁদ বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা। যতদিন আশপাশে পানি আছে, ততদিন কমবেশি এগুলো কেনাবেচা চলে।
বাঁশ-বেতের পণ্যের প্রবীণ ব্যবসায়ী ফখরুল মিয়া বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে এই হাটে ব্যবসা করছি। তবে দিন দিন বিক্রি কমছে।
হাটে আসা ষাটোর্ধ্ব সুনীল সুত্রধর বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালে থেকে বাবার সঙ্গে এ হাটে আসা শুরু হয়। আমার বাবাও দাদার সঙ্গে এ হাটে আসতেন।
আলাল মিয়া নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, সরকার বাজার ঐতিহ্যবাহী হাট। অনেক পুরোনো। শত বছর আগের। আমার দাদা, দাদারও দাদার আমল থেকে এটা চলে আসছে। এখানে হবিগঞ্জ, সিলেট থেকেও অনেকেই আসেন।
স্থানীয় লোকজন জানান দুপুর ১২টার পর থেকেই ধীরে ধীরে জমতে শুরু করে শতবর্ষী সরকার বাজারের সাপ্তাহিক হাট। বিভিন্ন স্থান থেকে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, বাঁশ-বেতের পণ্যসহ নানান সামগ্রী নিয়ে আসতে থাকেন বিক্রেতারা। একপাশে গবাদিপশুর হাঁকডাক, আরেক পাশে গ্রামের হস্তশিল্প পণ্যের কোলাহল— সব মিলিয়ে জমে ওঠে হাটের প্রাণচাঞ্চল্য।
তবে বিকেলের আলো ফুরাতে না ফুরাতেই হাট গুটিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়। ক্রেতা-বিক্রেতারা কেনাবেচা শেষে যার যার গন্তব্যে রওনা হন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও এখনও এই হাট ধরে রেখেছে গ্রামীণ জীবনের প্রাণবন্ত স্পর্শ।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 








