বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আদিবাসী তরুণদের নেতৃত্বে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ইউনেস্কো-ক্রিহ্যাপ ইউনেস্কো, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ক্রিহ্যাপ এবং অনুবাদ- এর যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আদিবাসী তরুণদের নেতৃত্ব ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রীমঙ্গলে পাঁচ দিনব্যাপী একটি কর্মশালা সম্পন্ন হয়েছে। ১৭–২১ মে পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলস্থ ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সিলেট বিভাগের তিনটি সম্প্রদায় — বিষ্ণুপ্রিয়া, মেইতেই এবং চা-জনগোষ্ঠী থেকে ১৫ জন আদিবাসী তরুণ অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউনেস্কো বাংলাদেশের প্রতিনিধি ও প্রধান ড. সুসান ভাইজ বলেন, “তরুণরা শুধু ভবিষ্যতের ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী নয়, তারা বর্তমান সময়েরও সক্রিয় সাংস্কৃতিক অংশীদার। এই কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, অডিওভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন, নৈতিক গবেষণা পদ্ধতি এবং অবহিত সম্মতি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কমিউনিটির ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
ক্রিহ্যাপের মহাপরিচালক ঝাং জিং বলেন, “সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে তরুণরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণ ও নথিভুক্তকরণে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই কর্মশালা আদিবাসী তরুণদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সক্রিয় রক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।”
কর্মশালার মাধ্যমে তারা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কমিউনিটি-ভিত্তিক তালিকাকরণে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেন। এর মধ্যে রয়েছে মৌখিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক চর্চা, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প এবং আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থার নথিভুক্তকরণ। কর্মশালাটি পরিচালনা করেন ইউনেস্কো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞ ড. আলেকজান্দ্রা ডেনেস এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশিক্ষক রিফাত মুনিম।
কারিগরি সেশন এবং শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা প্রবীণ ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক অনুশীলনকারী এবং কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন। তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপাদান শনাক্ত, নথিভুক্ত এবং খসড়া তালিকা প্রস্তুত করেন।
পাশাপাশি কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের দুই হাজার তিন সালের ইউনেস্কো কনভেনশনের মূলনীতি, নৈতিক নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া এবং অবাধ, পূর্বানুমোদিত ও অবহিত সম্মতি সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা হয়।
কমলগঞ্জের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকারী তৃষা সিনহা বলেন, “নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ শুরু করার পর এই কর্মশালাটি আমার জন্য অনেক অর্থবহ হয়ে উঠেছে। ছোটবেলায় শুধু বইয়ে ইউনেস্কো সম্পর্কে পড়েছি, কিন্তু এই প্রথমবার তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কার্যক্রমকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম।
কমলগঞ্জের শমশেরনগরের চা-জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকারী জিয়ানা মাদ্রাজি বলেন, “ইউনেস্কো ও ক্রিহ্যাপ আয়োজিত এই কর্মশালায় অংশ নিতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত ও গর্বিত। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চা-জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়েছে, বিশেষ করে পাতিচকা ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের দলের গবেষণার মাধ্যমে। এই কর্মশালা আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার কথা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
মৈতৈই সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকারী তাওরেম আতিয়া বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং ভবিষ্যতে নিজ জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গত কয়েক দিনে আমি অনেক নতুন বিষয় শিখেছি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নতুন বন্ধু পেয়েছি এবং আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।”
বাংলাদেশে ইউনেস্কো–ক্রিহ্যাপ আয়োজিত এই কর্মশালার লক্ষ্য ছিল কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন ঐতিহ্য সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা এবং নতুন প্রজন্মের তরুণ ঐতিহ্যকর্মী গড়ে তোলা।
আজকরে সিলেট/ডেস্ক/এসসিজে









