দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকায়।
বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়েই এই বিপুল লোকসানের হিসাব করা হয়েছে। একই সময়ে ভর্তুকি, উন্নয়ন সহায়তা ও অন্যান্য খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের মোট নিট আর্থিক সহায়তা বেড়ে প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশের সমান।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি কোষাগার থেকে এই বিপুল ব্যয় এখন দেশের অন্যতম বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আয় কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা ‘অসহনীয়’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মদক্ষতা ও আর্থিক ঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার ঢাকার একটি হোটেলে প্রকাশ করা হয়। বিশ্বব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ যৌথভাবে এ উপলক্ষে একটি কর্মশালার আয়োজন করে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশ।
বিদ্যুৎ খাতেই সবচেয়ে বেশি লোকসান
গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেই সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) একাই ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান করেছে।
উচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে অতিরিক্ত ক্ষমতা ভাড়া পরিশোধ এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় কম ট্যারিফ নির্ধারণকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবিত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং দুর্বল করপোরেট সুশাসন বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আরও যেসব প্রতিষ্ঠান বড় লোকসানে
বড় লোকসানি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং সার, চিনি ও পাট খাতের কয়েকটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক থাকলেও অনেক উৎপাদনমুখী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান গুনছে।
সুশাসনের সংকট বড় কারণ
গবেষণায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় গভীর সুশাসন সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। খণ্ডিত আইন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবকে দুর্বল পারফরম্যান্সের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ
প্রতিবেদনে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনাও করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদে মুনাফার হার ছিল ঋণাত্মক ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদে মুনাফার হার ছিল ইতিবাচক ৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে প্রায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ১০ শতাংশ সম্পদে মুনাফা অর্জন করতে পারে এবং ভর্তুকিনির্ভরতা কমানো যায়, তাহলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি আর্থিক সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবে।
সংস্কারের সুপারিশ
সংকট কাটাতে প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বাণিজ্যিকভাবে সক্ষম রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, আর্থিক তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং একচেটিয়া খাতে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা চালু করা।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করা এবং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন নেই এমন প্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণ অথবা বন্ধ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








