তারেক রহমানের আগমন ও নির্বাচন ঠেকাতেই কী সহিংসতা?
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৬:২৩ AM

তারেক রহমানের আগমন ও নির্বাচন ঠেকাতেই কী সহিংসতা?

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০/১২/২০২৫ ১০:০৮:৪৫ AM

তারেক রহমানের আগমন ও নির্বাচন ঠেকাতেই কী সহিংসতা?


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান সময়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এক ফ্যাসিবাদমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এ দেশের মানুষ নতুন যাত্রা শুরু করেছিল, ১৬ মাস পর এসে সেই স্বপ্ন এক গভীর সংকটের মুখে।

চলতি মাসের ১১ ডিসেম্বর বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে যখন দেশে উৎসবের আমেজ ফেরার কথা ছিল, ঠিক তখনই এক পরিকল্পিত অন্ধকার ছায়া গ্রাস করতে শুরু করেছে রাষ্ট্রকে। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

কিন্তু তফসিল ঘোষণার ঠিক পরদিন থেকেই দেশে যে ধরনের সহিংস ও মব সংস্কৃতি পুনরুত্থান ঘটেছে, তাতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ‘মব রাজনীতি’ কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষ করে বাংলাদেশে ফেরার আগমুহূর্তে এই অস্থিতিশীলতা কী কোনো বিশেষ সংকেত? প্রশ্ন উঠেছে, এই মব কি শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথ এবং একটি অবাধ নির্বাচনের সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে দিতে চায়?

গত ১১ ডিসেম্বর, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসিরউদ্দিন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেন, এই ঘোষণা দেশবাসীর জন্য ছিল স্বস্তির বার্তা। কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়িত্ব পায়নি ২৪ ঘণ্টাও। ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা শেষে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তফসিল ঘোষণার পরদিনই তরুণ ও উদীয়মান একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে টার্গেট করা ছিল রাজনীতির মাঠে একটি অশুভ বার্তা।

ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলেও ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পরপরই শুরু হয় এক নজিরবিহীন তাণ্ডব। ১৮ ডিসেম্বর রাতভর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দেশের শীর্ষ দুই গণমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

একই রাতে ধানমন্ডির সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছায়ানট ভবনেও হামলা চালানো হয়। প্রবীণ সাংবাদিক নুরুল কবীরও লাঞ্ছিত হন এক দল উন্মত্ত জনতার হাতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হাদির মৃত্যুকে আবেগি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর এই আক্রমণ মূলত দেশকে অস্থিতিশীল করে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওসমান বিন হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ১৮ ডিসেম্বরের সেই ভয়াবহ তাণ্ডবের নেপথ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ররোচনা ছিল স্পষ্ট। ফ্রান্স ও আমেরিকায় নির্বাসিত দুজন প্রভাবশালী ইউটিউবারের ফেসবুক স্ট্যাটাস ও উসকানিমূলক বক্তব্যের পরপরই ‘তৌহিদী জনতা’ নামধারী একদল চরম ডানপন্থি গোষ্ঠী রাজপথে নেমে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বাইরে বসে এই ধরনের প্ররোচনা এবং দেশের অভ্যন্তরে তার তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

আগামী ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার দিনক্ষণ যখন চূড়ান্ত, ঠিক তখনই এই ধরনের মব সংস্কৃতিকে উসকে দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। বিশ্লেষকদের মতে, এই উগ্রপন্থিরা চায় না দেশে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হোক। একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে এবং তারেক রহমানের মতো শক্তিশালী নেতৃত্ব দেশে উপস্থিত থাকলে এই ধরনের ‘ছদ্ম-রাজনৈতিক’ গোষ্ঠীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ১৮ ডিসেম্বরের হামলা ছিল মূলত একটি মহড়া, যার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মহলে এটি প্রমাণ করা যে বাংলাদেশ এখন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র নয় এবং এখানে নির্বাচন করার মতো পরিবেশ নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোজাহিদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর গত ১৬ মাসে বাংলাদেশে যে উগ্র ডানপন্থি বা ‘ফার-রাইট’ শক্তির উত্থান ঘটেছে, তারা মূলত একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে। যখনই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলো এবং তারেক রহমানের ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত হলো, তখনই এই গোষ্ঠীটিকে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করি। এর উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখানো যে বাংলাদেশে এখনো একটি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে দেশে ফিরছেন- এই খবরটিই বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা। কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তারেক রহমানের এই ফিরে আসা কেবল বিএনপির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্যই একটি জরুরি বিষয়। সায়ের মনে করেন, দেশের এই জটিল সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং প্রতিরক্ষা- এই তিন খাতেই একজন অভিজ্ঞ ও জনসমর্থিত নেতার প্রয়োজন, যা তারেক রহমানের মাধ্যমে পূরণ হতে পারে।

সাম্প্রতিক এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করতে সক্রিয় হয়েছে দেশি-বিদেশি নানা শক্তি। বিশেষ করে দক্ষিণপন্থিদের এই হঠাৎ উগ্রতা ভারতের বিজেপি-আরএসএস শাসিত সরকারের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ‘উপহার’। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে যত বেশি অস্থিরতা ও উগ্রবাদ প্রদর্শিত হবে, ভারত আন্তর্জাতিক মহলে তত বেশি প্রচার করতে পারবে যে তাদের সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। এর ফলে তারা পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় সাম্প্রদায়িক মেরূকরণ তীব্র করতে পারবে। 

জুলকারনাইন সায়ের তার বার্তায় আরও উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে বর্তমান দক্ষিণপন্থিদের ‘নর্থ-ইস্ট ভাগ করে দেবো’ বা ‘দূতাবাসে হামলা করবো’- এমন উগ্র স্লোগানগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং ভারতের ন্যারেটিভকে ন্যায্যতা দিচ্ছে। তারেক রহমানকে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে একচেটিয়া জনপ্রিয়তায় দেখতে চায় না নয়াদিল্লি, আর সেই কাজটিতেই পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে এ দেশের ফার-রাইট বা চরম ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো।

এদিকে ওসমান হাদির লাশ দেশে আসার পর ২০ ডিসেম্বর ঢাকায় যে জানাজার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জুলকারনাইন সায়ের ১৯ ডিসেম্বরের এক বার্তায় সতর্ক করেছেন যে, জানাজার আড়ালে সারা দেশ থেকে লোক জড়ো করে একটি ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে। এই চক্রটির পরিকল্পনা হলো জানাজার জনসমুদ্রকে ব্যবহার করে বিদেশি দূতাবাস ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানো। তিনি বলেন, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ভণ্ডুল করা এবং দেশে একটি অগণতান্ত্রিক বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা।

বিশ্ব রাজনীতিতে নির্বাচনের আগে মব সংস্কৃতি বা পরিকল্পিত দাঙ্গা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের উদাহরণ কম নেই। ১৯৫৩ সালে ইরানে সিআইএ-র মদদে ‘অপারেশন অ্যাজাক্স’- এর মাধ্যমে ঠিক এভাবেই ভাড়াটে দাঙ্গাবাজদের রাস্তায় নামিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোহাম্মদ মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল। প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে যখন জনরোষ তুঙ্গে ছিল, তখন একটি বিশেষ গোষ্ঠী সেই আন্দোলনকে উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল।

আবার ১৯৯০-এর দশকে আলজেরিয়ায় যখন একটি দল নির্বাচনে জেতার দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন ডিপ স্টেট পরিকল্পিতভাবে দেশে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করে নির্বাচন বাতিল করেছিল। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ১৮ ডিসেম্বরের ঘটনাগুলো সেই পুরোনো ইতিহাসেরই এক আধুনিক সংস্করণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যখনই কোনো দেশে বড় পরিবর্তনের পর একটি শক্তিশালী নেতৃত্ব ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখনই এই ধরনের ‘মব’ বা ‘বিপ্লবী’ নামধারী ছদ্মবেশী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ এক অগ্নিপরীক্ষার মুখে। দীর্ঘ ১৬ মাস ধরে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং মব কালচার দমনে তাদের নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। এই মুহূর্তে তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি দলের রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং তা দেশের স্থিতিশীলতার সাথে যুক্ত।

তারেক রহমান দেশে ফিরলে বিএনপির বিশাল কর্মী বাহিনীকে শৃঙ্খলায় রাখা এবং মব রাজনীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। তারা বলছেন, ভারতের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে একটি শক্তিশালী নির্বাচিত সরকারের কোনো বিকল্প নেই। আর সেই সরকার গঠনের প্রাথমিক ধাপ হলো ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। 

তারা আরও মনে করছেন, ষড়যন্ত্রকারীরা জানে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেয়, তবে তাদের ‘ছদ্ম-রাজনৈতিক’ ও ‘মব ভিত্তিক’ শাসনের অবসান ঘটবে। তাই তারা ওসমান হাদির মতো তরুণদের প্রাণ কেড়ে নিয়ে বা সংবাদমাধ্যম পুড়িয়ে দেশে একটি ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরি করতে চাচ্ছে।

তফসিল ঘোষণার পর থেকে যে অরাজকতা শুরু হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হলো তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা এবং জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ৫ আগস্টের বিপ্লবের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, তারা কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদ বা উগ্রবাদকে আর বরদাস্ত করবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচনের রোডম্যাপ থেকে বিচ্যুত হওয়া হবে আত্মঘাতী।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর