হাওরে ধান তলিয়ে নিঃস্ব কৃষক, সহায়তার তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৭:৫৩ PM

ধান গেল পানিতে, সহায়তা যাচ্ছে ঘনিষ্ঠদের পকেটে

হাওরে ধান তলিয়ে নিঃস্ব কৃষক, সহায়তার তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩/০৫/২০২৬ ০৬:৪৭:০২ PM

হাওরে ধান তলিয়ে নিঃস্ব কৃষক, সহায়তার তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ


সুনামগঞ্জের দেখার হাওর সংলগ্ন খলায় ধান শুকাতে ব্যস্ত কৃষক আব্দুল্লাহ মুকিত। সাত একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। কিন্তু টানা ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় পাঁচ একরের ধান এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বড় পরিবার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোর একমাত্র ভরসা ছিল এই ফসল। এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

আক্ষেপ করে আব্দুল্লাহ মুকিত বলেন, দিনভর ধান শুকানোর চেষ্টা করছি। সরকারি সহায়তার পেছনে দৌড়ানোর সময় কোথায়? যারা চাষাবাদই করে না, তারাও দেখি তালিকার জন্য ঘুরছে। অথচ আমার আইডি কার্ড এখনো কেউ নেয়নি। জানি না প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা আমাদের ভাগ্যে জুটবে কিনা।

শুধু মুকিত নন, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের দেখার হাওরের অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সঙ্গেই এখনো সহায়তার বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সহায়তায় সরকার ২০ কেজি চাল ও নগদ অর্থ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এজন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় সেই তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকেই তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, যারা প্রকৃতপক্ষে চাষাবাদ করেন না, তারাও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তালিকায় নাম তুলতে তৎপর। অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকেই নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় বঞ্চিত হচ্ছেন।

দেখার হাওরের কৃষক শফিক মিয়া বলেন, হাওরে প্রায় সব কৃষকেরই ধানের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু আইডি কার্ড নেওয়া হচ্ছে মূলত তাদেরই, যারা নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ।

এ বিষয়ে লক্ষণশ্রী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন তালুকদার বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশনা আসায় কিছু ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। তবে এখন প্রতিটি ইউনিয়নে পাঁচ সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হচ্ছে।

তিনি জানান, কমিটিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বিএনপির দুজন প্রতিনিধি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও কৃষি বিভাগের প্রতিনিধিরা থাকবেন। তারা সরেজমিন যাচাই করে দ্রুত চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করবেন।

শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়া বলেন, জেলার সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা শাল্লা। সেখানে ব্যাপকভাবে ধানের ক্ষতি হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি ২৯ সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেছেন।

তিনি আরও বলেন, সরকার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ ক্যাটাগরিতে সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ২০ কেজি চালের পাশাপাশি তিন ক্যাটাগরিতে যথাক্রমে ৭ হাজার পাঁচশত, ৫ হাজার ও ২ হাজার পাঁচশত টাকা দেওয়া হবে। তবে এই ক্যাটাগরি নির্ধারণ নিয়েও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান বলেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৯৮ হাজার কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করা হলেও বর্তমানে সেগুলো যাচাই-বাছাই ও সংযুক্তির কাজ চলছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, তালিকা তৈরিতে কোনো ধরনের দলীয় প্রভাব বা দুর্নীতির সুযোগ দেওয়া হবে না। স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ ও কৃষি বিভাগকে সরেজমিনে গিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আজকের সিলেট/এপি

সিলেটজুড়ে


মহানগর