কেউ বলছেন অমুক মার্কায় ভোট দিলে ‘জান্নাত’ পাওয়া যাবে, কেউ বলছেন তমুক মার্কায় ভোট দিলে দেশে ‘কোরআন সুন্নাহর বাইরে আইন হবে না’। কেউ কেউ আরও আগ বাড়িয়ে চলে যাচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বীকে ব্যক্তিগত আক্রমণে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে ‘ধর্মের ব্যবহার’ দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। কিন্তু সভ্যতা দিন দিন আধুনিক থেকে আধুনিকতর হতে থাকলেও রাজনীতিবিদদের এমন ‘ধর্মাশ্রয়’ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোটের জন্য ধর্মের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের এমন অপব্যবহার সুস্থধারার রাজনৈতিক চর্চাকে কোণঠাসা করে ফেলছে। শুধু তাই নয়, ঝুঁকিতে ফেলছে রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকেও।
ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির এমন উত্থানের বিষয়টি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সমীক্ষা ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। তারা এর কারণ হিসেবে বলছে, দেশে দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ না থাকা, অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ধর্মপন্থা এবং উগ্র রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের প্রভাব দেশেও এই প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণে উদারপন্থি থেকে বামপন্থি, ইসলামপন্থি থেকে স্বতন্ত্র প্রায় সব পক্ষের প্রার্থীই বেশভূষা পরিবর্তন করেছেন। কেউ পরছেন টুপি-পাঞ্জাবি, কারও মাথায় নতুন করে দেখা যাচ্ছে ঘোমটা। বেশভূষার সঙ্গে সঙ্গে ভাষায়ও লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে প্রার্থীদের।
ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতাদের অনেক আগে থেকেই ধর্মীয় পোশাক পরতে দেখা গেলেও জনসংযোগের সময় তারা ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহার করছেন।
‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’
‘জান্নাতের টিকিট’ মিলবে বলে জামায়াতে ইসলামীর লোকেরা দাঁড়িপাল্লায় ভোট চাইছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওর বরাতে গত ১৪ অক্টোবর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, “জামায়াতে ইসলামী ভোটের নামে ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি করে’ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। বাড়িতে বাড়িতে তাদের কর্মীদের পাঠিয়ে বলছে, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে এটি বেহেশতের রাস্তা সুগম করবে। এইটা তো খ্রিস্টান পাদ্রীরা মধ্যযুগে, অন্ধকার যুগে করেছে। জামায়াতে ইসলাম কী আবার অন্ধকার যুগ নিয়ে আসতে চাচ্ছে এই জান্নাতের টিকিট বিক্রি করে?”
২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী নওগাঁর আত্রাই উপজেলা শাখার আয়োজনে এক সুধী সমাবেশে ওই দলপন্থি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার কবিরের একটি বক্তব্য দেন, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘জামায়াত ইসলাম করাটা আপনার আমার নৈতিক দায়িত্ব।
কী দায়িত্ব? নৈতিক দায়িত্ব। কী জন্য?
যদি আপনি জান্নাতে যেতে চান। আর জান্নাতে যেতে না চাইলে কোনো সমস্যা নাই। কারণ ৭২ কাতারের মধ্যে প্রথম কাতারে থাকতে চাইলে, জান্নাত পেতে চাইলে জামায়াত ইসলাম করতে হবে। এর মধ্যে আর দ্বিতীয় কোনো অপশন—নাই বাবা।’
এছাড়া সম্প্রতি ঝালকাঠিতে জামায়াতের প্রার্থী ফয়জুল হকের একটি বক্তব্যও ভাইরাল হয়। যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বিড়িতে সুখটানের মধ্যেও দাঁড়িপাল্লার দাওয়াত দিলে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারে’।
নতুন করে মাথায় টুপি-ঘোমটা
এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ অনেক রাজনীতিককে নির্বাচনী সভা-সমাবেশে টুপি মাথায় দেখা গেছে। ঘোমটা পরে নির্বাচনী কার্যক্রমে দেখা গেছে আলোচিত মডেল ও গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থী মেঘনা আলমকেও।
গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মিলিত ইমাম খতিব পরিষদ আয়োজিত জাতীয় সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিএনপি মদিনার ইসলামে বিশ্বাস করে এবং বাংলাদেশে যত ফিরকা-ফেতনা আছে, এগুলোর অবসান চায়। কোরআন ও সুন্নাহর বিপরীতে বাংলাদেশে কোনো কানুন (আইন) করা হবে না। যদি আগে করা হয়ে থাকে, সেটি বাতিল করা হবে।’
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের অতীত
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার সামনে আসে। সেসময় বিএনপির প্রচারণায় ছিল, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আজান বন্ধ হয়ে যাবে, মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনি দেওয়া হবে।’ তাদের দলের স্লোগান ছিল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ধানের শীষে বিসমিল্লাহ’।
পরের নির্বাচনে ১৯৯৬ সালে একইভাবে ধর্মের ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে তারা বিএনপির অনুকরণে স্লোগান ধরে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’।
আর ওমরাহ হজ করে এসে মাথায় কালো কাপড়, লম্বা হাতার ব্লাউজ আর হাতে তসবিহ নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি সেবার নির্বাচনী সফর শুরু করেন শাহজালালের মাজার জিয়ারত করে। প্রার্থনারত অবস্থায় তার ছবি ছাপিয়ে করা হয় পোস্টার।
২০২৩ সালে সিলেটের এক নির্বাচনী জনসভায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এই নৌকা নূহ নবীর নৌকা’। ওই বছর বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের মেয়র পদপ্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেছিলেন, ‘আপনি যদি হাতপাখা প্রতীকে ভোট দেন, তাহলে ভোটটা পাবে ইসলাম এবং আল্লাহর নবী’।
পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ ইসলামী দলের প্রার্থিতা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে ওই দল এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেখা যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন একটি জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোটকে। জামায়াতের জোটে গণঅভ্যুত্থানের সংগঠকদের দল এনসিপি থাকলেও এখানে বেশিরভাগই ইসলামী দল। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত উদারপন্থার বিএনপি জোটেও আছে ইসলামী দল। এছাড়া জামায়াত জোট থেকে শেষ মুহূর্তে বেরিয়ে যাওয়া ইসলামী দল চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
এই ইসলামী আন্দোলন জামায়াতের সঙ্গে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ গড়েও বেরিয়ে যাওয়ার কারণ ‘শরীয়াহ আইন’ নিয়ে দ্বন্দ্ব। জামায়াত ‘শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না’ বলে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি প্রতিনিধিদলকে জানানোর পর চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন নাখোশ হয়। তারা জানায়, শরীয়াহ আইনের আদর্শেই জোট হয়েছে, সেটা না থাকলে ওই জোটে থাকার যৌক্তিকতা নেই।
টিআইবি বলছে, নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৮১ জন এবং তাদের প্রায় ১৩ শতাংশ স্বতন্ত্র। মোট প্রার্থীর মধ্যে ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রার্থীই ৩৬ শতাংশ। যা বিগত পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ।
‘আমি-ডামি’ খ্যাত ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রার্থী ছিল ইসলামী দলগুলো থেকে। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরুতে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হলে ইসলামী দলগুলোর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। সেবার ইসলামী দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তার আগের ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার আশঙ্কায় ইসলামী দলগুলোও কম আসে। ওই বছরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মাত্র ১ দশমিক ১৩ শতাংশ ছিল ইসলামী দলের। আর ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়ায় সেবার মোট প্রার্থীদের মধ্যে ইসলামী দলগুলোর প্রার্থী ছিল ২২ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতায় ইসলামী দলগুলোর অংশগ্রহণ সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ অতিক্রম করেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেহেতু ইসলামপন্থি দলগুলোর বৈধভাবে রাজনীতি করার অধিকার আছে, এটা মেনে তারা রাজনীতি করেছে। সে ধারায় আগের চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ বেড়েছে। অর্থ ও পেশিশক্তির সঙ্গে অংশ হিসেবে ধর্ম যুক্ত হয়েছে। যেটি নিয়ে আমাদের ভাবনার সুযোগ আছে।
তিনি বলেন, রাজনীতিতে তিন বিষয় আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়। তা হলো অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্ম। এই তিনটি বিষয় প্রকট হওয়ায় সুস্থধারার রাজনীতি কোণঠাসা হচ্ছে। আর অসুস্থধারার রাজনীতির সেই জায়গাটা দখল করছে।
টিআইবি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনে ইসলামপন্থি কার্যক্রমের বৃদ্ধিকেও ইঙ্গিত করেছে তাদের প্রতিবেদনে।
অর্থ-ধর্মের ব্যবহার বাড়া নিয়ে দরকার অনুসন্ধান
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ড. আনু মুহাম্মদের মতে, ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত অবস্থাতেও রাজনীতিতে অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্মের ব্যবহার কমার কথা ছিল। সংস্কার উদ্যোগেও তা বলা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং উল্টো ঘটনা ঘটছে, অর্থ ও ধর্ম একত্রিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ধর্মের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থের প্রভাবও বাড়ছে। অর্থশক্তি ও ধর্মের ব্যবহার—দুটো একই সঙ্গে কেন বাড়ছে এটা একটি অনুসন্ধানের বিষয়। এতে নির্বাচনের সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কোনো দেশে যে ধর্মের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ, ওই ধর্মের রাজনৈতিক দলে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশের পাশে ভারত, সেখানেও সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বর্তমান সময়ে এত সংস্কারের কথা শুনলাম, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অর্থশক্তি, পেশিশক্তি—এগুলো থেকে মুক্ত করার কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। কারণ জামানতের টাকাটা বেড়েছে, ব্যক্তিগত খরচের অনুমতি থাকলো—রাষ্ট্র কোনো উদ্যোগ নিল না। এমন পরিবর্তন হয়নি যাতে যার পেশিশক্তি নেই, যার অর্থশক্তি নেই, বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়, সে অংশগ্রহণ করতে পারে, রাষ্ট্র এমন নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করতে পারেনি। ফলে আগেও যেমন অর্থ, পেশিশক্তি, চোরাই টাকার প্রভাব নির্ধারক ছিল, এখনো সেই পরিস্থিতি আছে। নির্বাচনে ধর্ম আগে যেভাবে ব্যবহার হতো, এখন সেটা অন্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বা বাংলাদেশের ভেতরেও অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতির বহু বছরের ফলাফল হিসেবে ধর্মের ব্যবহার অনেক বেশি বেড়েছে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ইসলামী দল বলতে গেলে জামায়াতে ইসলামী প্রধান দল। দলটির লক্ষ্য ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন। এজন্য যখন প্রয়োজন, ধর্ম ব্যবহার করছে; যখন প্রয়োজন, ধর্মের অনুষ্ঠানিকতা ও শরীয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার অবস্থান থেকে সরে আসছে; যখন প্রয়োজন, নারী নেতৃত্বের সমালোচনা করছে। আবার নারী নেতৃত্বের অধীনে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজনীতি মানে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের খামখেয়ালিপনা। অর্থাৎ তারা যা বলে তা তারা করে না। এটা হলো জনগণের ধারণা। এজন্য রাজনৈতিক দলের ওপর কোনো কিছু নির্ভর করতে পারবেন না। কেন পারবেন না—যদি কোনো রাজনৈতিক দল বলে, আমি এখন নির্বাচন চাই, দুইদিন পরই এসে বলবে এই নির্বাচন আমি মানি না। কোনো রাজনৈতিক দল যদি বলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দরকার, দুইদিন পর যদি তার পক্ষে সব থাকে, তাহলে লেভেল ফিল্ড সম্পর্কে কিছু বলবে না। এগুলো আমাদের দেশের দলগুলোর সামগ্রিক রাজনৈতিক চরিত্র। সুতরাং জামায়াতে ইসলামীও এর বাইরে নয়।
তিনি বলেন, এখানে জামায়াতে ইসলামীকে অনেক আগে কিছু মানুষ মনে করতো এটি একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল। আসলে এই নির্বাচন বা ৫ আগস্টের পর তারা যেভাবে রাজনীতি করছে, তাতে তারা বিশেষ ধর্মীয় রাজনৈতিক বলা যাবে না। এটা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদের মতো একটি দল। ধরুন ইসলামী দল হলে হিন্দু রাজনীতি করার কথা নয়। তারা এবার হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে। তারা ১৯৯৬-এর আগে বলেছিল, নারী নেতৃত্ব গ্রহণ করবে না। সেই নারী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিত্বও নিয়েছে। তার মানে মুখে যা বলে, তা করে না। এটা হলো বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যা জামায়াতের মধ্যেও রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের বাইরে কোনো দল নেই। যদিও ধর্মীয় দলগুলো মানুষ আলাদা চিন্তা করতে চেয়েছিল।
‘ধর্ম নিয়ে তারা কথা বলে, তারা যা বলবে, ধর্ম মোতাবেক সেটাই হওয়া উচিত। ৫ আগস্টের পর স্বাভাবিক রাজনৈতিক দলগুলোর যে বৈশিষ্ট্য, তারা সেই বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই ঢুকে গেছে। আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই।’
তিনি বলেন, নারী নেতৃত্ব তারা চায় কি চায় না, এটা অস্পষ্ট। তারা মুখে বলে নারী স্বাধীনতা বিশ্বাস করে, আবার প্রথম প্রথম দল সৃষ্টি করার সময় বলেছিল নারীকে ঘরে থাকতে হবে। কিছুদিন আগে নারীর কর্ম ঘণ্টা কমানোর কথা বলা হয়েছিল। সেই চিন্তা থেকে বলা হয়েছিল নারী বাইরে থাকলে ভালো বংশধর তৈরি হবে না। নারী বাসায় থাকবে, সন্তানদের ভালো মানুষ করবে। নারীর নিয়ে তাদের বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য আছে।
বিরক্ত সচেতন মহল
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, দেশের ভোটারদের বড় একটি অংশের শিক্ষা না থাকায় এবং সচেতনতা না থাকায় তাদের ধর্ম বিশ্বাসের জায়গায় হাত দিয়ে ভোট হাতিয়ে নিতে চায় দলগুলো। যদিও আদতে তা ফল দেয় না বলেই বারবার প্রতীয়মান হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামপন্থি কোনো দলকেই বিগত নির্বাচনগুলোতে সরকার গঠন করতে দেখা যায়নি।
কিন্তু এই চর্চায় বিরক্ত সচেতন মহল। তারা বলছেন, লেবাস বা বেশভূষা বদলানো একধরনের প্রতারণা। যিনি নিজের আসল রূপ ছেড়ে কেবল ভোটের জন্য অন্য রূপ ধরেন, তাকে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চাকারী বলা যেতে পারে না।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








