আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) একটি সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে টুর্নামেন্ট থেকে দলটিকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বিশ্ব ক্রিকেটে ন্যায্যতার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রভাবশালী ক্রিকেট সাময়িকী উইজডেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে উইজডেন তাদের বিশ্লেষণে তুলনা টেনেছে ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সঙ্গে। সে সময় পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য টুর্নামেন্টে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত। নিরপেক্ষ ভেন্যু চেয়ে তাদের আবেদনের পর আইসিসি শেষ পর্যন্ত ভারতের দাবি মেনে নেয় এবং দুবাইয়ে ম্যাচ আয়োজনের ব্যবস্থা করে। অথচ একই ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আবেদন আমলে না নেওয়ায় ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ এর অভিযোগ সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক এই সংকটের সূত্রপাত আইপিএল নিলাম থেকে। কলকাতা নাইট রাইডার্স বিপুল অর্থ ব্যয় করে মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিলেও পরবর্তীতে তাকে না খেলার নির্দেশ দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)।
ভারতীয় গণমাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক আবহ ও উগ্র প্রচারণার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। মুস্তাফিজকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) খেলোয়াড় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ আইসিসির কাছে অনুরোধ জানায়, বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো যেন ভারতের বাইরে নিরপেক্ষ কোনো ভেন্যুতে আয়োজন করা হয়। বিসিবির যুক্তি ছিল যদি একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তবে পুরো দল, সাপোর্ট স্টাফ, সমর্থক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? তবে জয় শাহর নেতৃত্বাধীন আইসিসি সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। বরং ভারতেই খেলতে হবে এমন নির্দেশ দিয়ে অনড় অবস্থান নেয় তারা।
আইসিসির সেই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে বিকল্প হিসেবে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াকে নজিরবিহীন ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে উইজডেন।
উইজডেনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সময়ের ব্যবধানও প্রশ্নের জন্ম দেয়। ভারত তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে পেয়েছিল প্রায় তিন মাস সময়, অথচ সূচি ঘোষণার পর বাংলাদেশের হাতে ছিল মাত্র এক মাস। এই পার্থক্য কি আইসিসির ন্যায্যতার সংজ্ঞাকে বৈধতা দিতে পারে সে প্রশ্ন তুলেছে সাময়িকীটি।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়, মুস্তাফিজ ইস্যুতে বিসিসিআই কখনোই স্পষ্ট করে নিরাপত্তার কারণ উল্লেখ করেনি। ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতি’ এই অস্পষ্ট ব্যাখ্যার মধ্য দিয়েই একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া হয়, যা রাজনৈতিক বার্তার ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করছে উইজডেন।
তাদের মতে, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ভারত ক্রিকেটকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আইসিসির রাজস্ব কাঠামোয় ভারতের ভূমিকা এতটাই বড় যে, তাদের অনুপস্থিতিতে কোনো বড় টুর্নামেন্ট কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে। ফলে সিদ্ধান্তের ভারসাম্য শুরু থেকেই ভারতের দিকে ঝুঁকে থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা না থাকায় নীতিগত অবস্থান নেওয়ার খেসারত দিতে হয়েছে দলটিকে। উইজডেনের ভাষায়, বাংলাদেশ তিন সপ্তাহ আগেও ভাবেনি যে তারা টুর্নামেন্টের বাইরে থাকবে কিন্তু নিজেদের খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মানের প্রশ্নে দাঁড়ানোর মূল্য দিতে হয়েছে।
এই বিশ্লেষণে শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়েছে আইসিসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নীতি ও ন্যায্যতার চেয়ে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো ক্রিকেটপ্রেমী দেশগুলোর সামনে নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থাকার লড়াইই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
ক্রীড়া ডেস্ক 








