‘নীরব ভোট’-এর সমীকরণ: বিদ্রোহ, জোট টানাপোড়েন ও চার নিয়ামকের ছায়া
বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩২ PM

সিলেটের ১৯ আসনে

‘নীরব ভোট’-এর সমীকরণ: বিদ্রোহ, জোট টানাপোড়েন ও চার নিয়ামকের ছায়া

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১/০২/২০২৬ ০২:১১:৩৪ PM

‘নীরব ভোট’-এর সমীকরণ: বিদ্রোহ, জোট টানাপোড়েন ও চার নিয়ামকের ছায়া


জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনেই ভোটের সমীকরণ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। প্রধান দুই জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও মাঠের বাস্তবতা বলছে এই নির্বাচনে দৃশ্যমান লড়াইয়ের পাশাপাশি বড় ভূমিকা রাখতে পারে ‘নীরব ভোট’। বিদ্রোহী প্রার্থী, জোটের সমঝোতা, সংখ্যালঘু ভোট, চা–শ্রমিক এবং অরাজনৈতিক সংগঠন আঞ্জুমানে আল ইসলাহর অবস্থান সব মিলিয়ে জয়–পরাজয়ের অঙ্ক বদলে যাচ্ছে প্রায় প্রতিটি আসনে।

সিলেট বিভাগে মোট ভোটার প্রায় ৯১ লাখ ৬৮ হাজার। এর মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী। বিভিন্ন আসনে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট রয়েছে আঞ্জুমানে আল ইসলাহর অনুসারীদের। চা–বাগান অধ্যুষিত একাধিক আসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক ভোটার রয়েছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না তা নিয়েও রয়েছে আলোচনা। মাঠপর্যায়ের একাধিক নেতা ধারণা করছেন, দলটির ৮ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে যেতে পারেন।

চার নিয়ামকের ছায়া

ফুলতলী পীর প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে আল ইসলাহ এবার সিলেটের রাজনীতিতে আলোচিত ‘নীরব শক্তি’। সংগঠনটির প্রভাব রয়েছে সিলেট-১, ২, ৩, ৫ ও ৬ সুনামগঞ্জ-৩ ও ৫; মৌলভীবাজার-২ ও ৪ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধিকাংশ আসনে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা বিএনপি প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকছেন। ইতোমধ্যে সিলেট-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীরকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়েছে তারা।

চা–শ্রমিক ভোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মৌলভীবাজার-৪ আসনে চা–শ্রমিক ভোটার প্রায় এক লাখ। সিলেট-১, ৩ ও ৪ আসনে রয়েছে ২০ থেকে ৩০ হাজার করে শ্রমিক ভোট। অতীতে এ ভোট আওয়ামী লীগের ঘরেই ছিল বলে ধরে নেওয়া হতো। এবার সেই ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে বিএনপি ও জামায়াত দুই পক্ষই শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছে, দিচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি।

সংখ্যালঘু ভোট এবং আওয়ামী লীগের ‘নীরব ভোটার’ এই দুই উপাদানও শেষ মুহূর্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

বিদ্রোহে অস্বস্তি বিএনপিতে

বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ দলের ভেতর থেকেই। মনোনয়ন না পাওয়া একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও অনেকেই প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্রোহী ও শরিক দলের প্রার্থীদের আসনে অন্তত ৩০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তবে এতে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমদের বিপরীতে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেন। সুনামগঞ্জ-৪ আসনে অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। সিলেট-৫ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের বিপক্ষে মাঠে আছেন বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশিদ।

মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপির মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরীর বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া মধু শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। হবিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়ার বিপক্ষে সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এসব আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সিলেট-১ আসনেও মনোনয়ন নিয়ে ভেতরের অসন্তোষ ছিল। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর মনোনয়ন পেলেও একই পদমর্যাদার আরিফুল হক চৌধুরীকে দেওয়া হয় সিলেট-৪ আসনে। স্থানীয় নেতাদের একাংশ মনে করেন, আরিফুল হক চৌধুরী সদরে প্রার্থী হলে ফল ভিন্ন হতে পারত।

জোটে দুর্বল জামায়াত

জোট রাজনীতিও প্রভাব ফেলছে ভোটের অঙ্কে। সম্ভাবনাময় কয়েকটি আসনে নিজস্ব প্রার্থী না থাকায় জামায়াতের কর্মী–সমর্থকদের মধ্যে অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

সিলেট-৩ আসনে দীর্ঘদিন প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন দক্ষিণ সুরমার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ। জোটের সিদ্ধান্তে তিনি সরে দাঁড়ান। সেখানে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এতে জামায়াতের কর্মীদের উৎসাহ কমেছে।

সিলেট-২ আসনেও একই চিত্র। জোটের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসির আলী হলেও এর আগে জামায়াতের অধ্যাপক আব্দুল হান্নান প্রচারণা চালিয়েছিলেন। দলীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও জোটের সমীকরণে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।

‘নীরব ভোট’-এর অপেক্ষা

সব মিলিয়ে সিলেটের ১৯ আসনে এবার দৃশ্যমান প্রচারণার চেয়ে অদৃশ্য সমীকরণই বেশি আলোচিত। বিদ্রোহী প্রার্থী, জোটের টানাপোড়েন, আল ইসলাহর অবস্থান, চা–শ্রমিক ও সংখ্যালঘু ভোট এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য ‘নীরব ভোটার’।

মাঠের রাজনৈতিক কর্মীরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত কে কেন্দ্রে যাবে আর কে যাবে না সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে অনেক আসনের ফল। তাই দৃশ্যমান লড়াইয়ের আড়ালে সিলেটে এখন অপেক্ষা ‘নীরব শক্তি’র।

আজকের সিলেট/এপি

সিলেটজুড়ে


মহানগর