জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের জন্য দেশে যে ‘স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি’ (Automatic Pricing Mechanism) চালু রয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) নিজের তৈরি সেই পদ্ধতি মানছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিপিসির ওই পদ্ধতি অনুসারে, প্রতি মাসের আন্তর্জাতিক গড় মূল্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী মাসের দেশীয় দাম নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু গত ১৯ এপ্রিল জ্বালানির দাম যেভাবে লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, তাতে ওই গাণিতিক ফর্মুলার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যখন প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে থাকে, তখন দেশে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা হওয়া কোনোভাবেই ফর্মুলাসম্মত নয়।
গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২-১৫ ডলার কমেছে (১১০-১১৫ ডলার থেকে ৯৫ ডলারে নেমেছে)। সূত্র অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ১০ ডলার কমলে স্থানীয় বাজারে লিটারপ্রতি প্রায় ৭-৮ টাকা কমার কথা। সেই হিসাবে দাম কমার কথা থাকলেও সরকার বাড়িয়েছে ১৫-২০ টাকা।
এ প্রসঙ্গে ক্যাবের উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম বলেন, সরকারের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা বিপিসির অটো প্রাইসিং ফর্মুলার সাথে সাংঘর্ষিক। যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছিল, তখন সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো, আর এখন কেন খামাখা দাম বাড়িয়ে জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হওয়ার পথে গেল তা আমার বোধগম্য নয়। যারা এতোদিন জ্বালানি তেল ধরে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলো, অধিক মুনাফার সুযোগ করে দেওয়া হলো তাদেরই।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও গত ১৫ দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি উল্লেখ করে জ্বালানি বিশ্লেষক ইঞ্জিনিয়ার ফরিদ আহমেদ পাঠান বলেন, বিপিসির স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা যেখানে তেলের দাম কমার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, সেখানে সরকারের এই ‘প্রশাসনিক’ মূল্যবৃদ্ধি মূলত স্বচ্ছ বাজার পদ্ধতির পরিপন্থী। এটি ফর্মুলাভিত্তিক সমন্বয় নয়, বরং রাজস্ব সংগ্রহের একটি কৌশল বলেই মনে হচ্ছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা সাধারণত মাসের শুরুতে বা নির্দিষ্ট সময় পর পর কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু ১৯ এপ্রিলের এই আকস্মিক ঘোষণাটি ফর্মুলার ধারাবাহিকতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
এ প্রসঙ্গে ড. শামসুল আলম বলছেন, সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে দর্শন। একটা গণতান্ত্রিক সরকারের দর্শন হওয়া উচিত জনকল্যাণ। এখানে অবৈধ মওজুদদারদের লাভবান করে জনগণকে কষ্ট দেওয়া হলো।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই না দিয়ে তেলের ওপর আরোপিত উচ্চমাত্রার শুল্ক ও ভ্যাট সমন্বয় করলে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হতো না। জ্বালানি তেলের ওপর বর্তমানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট আরোপিত আছে। যদি সরকার শুল্ক কিছুটা কমিয়ে সমন্বয় করত, তবে দাম ১০০ টাকার নিচে রাখা সম্ভব ছিল।’
উল্লেখ্য, বিপিসির স্বয়ক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে প্রিমিয়াম, এলসি খরচ, অপারেশনাল খরচ, বিপিসির মুনাফা এবং ভ্যাট ও ট্যাক্স যুক্ত করা। কিন্তু সদ্যঘোষিত মূল্যে বিপিসির মুনাফা ও ট্যাক্স অংশটি অপরিবর্তিত রেখে কেবল আমদানিমূল্যের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা মূলত ডলার সংকট মোকাবিলা এবং আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্ত পূরণের জন্যই করা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








