উৎসবের মাসে বিষাদের ছায়া
মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ১০:৫৯ AM

উৎসবের মাসে বিষাদের ছায়া

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৫/০৫/২০২৬ ০৯:৩৬:৩৩ AM

উৎসবের মাসে বিষাদের ছায়া


হাওরবাসীর কাছে বৈশাখ মানেই উৎসবের মাস। দীর্ঘ তিন মাসের ঘাম ঝরানো সোনালি ফসল ঘরে তোলার মাহেন্দ্রক্ষণ এটি। একদিকে নতুন ধানের ঘ্রাণ, অন্যদিকে পিঠাপুলির আমেজে জমে ওঠে গ্রামীণ উৎসব। শহুরে স্বজনরাও সেই আনন্দ ভাগাভাগি করতে ছুটে আসেন গ্রামে। কিন্তু এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন, উৎসবের সেই চিরাচরিত প্রাণচাঞ্চল্য নেই। বরং হবিগঞ্জের প্রতিটি হাওরজুড়ে এখন কেবলই বিষাদের ছায়া। এবারের বৈশাখ হাহাকার হয়ে ধরা দিয়েছে হাওরবাসীর জীবনে।

জানা গেছে, জেলার হাওরাঞ্চলে এক-তৃতীয়াংশ জমির ধান কাটতে পারলেও দুই-তৃতীয়াংশ পানিতে ডুবে আছে। কারও সব ধানই তলিয়ে গেছে, কেউবা কিছু কাটতে পারলেও বৃষ্টির কারণে শুকাতে পারেনি। স্তূপ করে রাখা ধানে চারা গজিয়েছে, ধরেছে পচন। চোখের সামনে হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল নষ্ট হতে দেখে শোকে পাথর হয়ে পড়েছেন অনেকেই।

নবীগঞ্জের বৈলাকিপুর গ্রামের বাসিন্দা অলিউর রহমান বলেন, ২০ কেদার (প্রতি কেদার ৩০ শতাংশ) জমিতে আবাদ করেছিলাম। ধানও কেটেছি, কিন্তু লাভ কিছুই নেই। রোদ না থাকায় সব ধান পচে গেছে। খাওয়ার উপযোগী এক মণ ধানও টিকবে না। এসব পচা ধান বিক্রি করা যাবে কি না, তাও জানি না। যদি কেউ নেয়ও, দাম পাওয়া যাবে সামান্য। এখন আর কৃষিকাজ করে কোনো লাভ নেই।

তিনি আরও বলেন, বৈশাখ আমাদের অত্যন্ত আনন্দের মাস। নতুন ধান তোলার সঙ্গে চলে পিঠাপুলির উৎসব। এবার সেই আনন্দ নেই, কারো মুখে হাসি নেই।

বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর শতমুখা গ্রামের মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, খোয়াই নদীতে সামান্য পানি বাড়লেই হাওরের সব জমি তলিয়ে যায়। এবার ধান পাকা শুরু করতেই সব তলিয়ে গেল। দু-এক কেদার জমির ধান কাটতে পারলেও তাতে পচন ধরেছে।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, বৈশাখ এলেই সারা বছরের খাবার জোগাড় আর আত্মীয়-স্বজনের আগমনে মুখর থাকতো চারপাশ। এবার নিজেদেরই খাবার নেই, উৎসব করব কী দিয়ে?

আতুকুড়া গ্রামের বাসিন্দা এস এম সুরুজ আলী বলেন, জমিজমা যা ছিল সব শেষ। শ্রমিক পাওয়া যায় না, আবার পানির জন্য হারভেস্টার মেশিনও নামানো যাচ্ছে না। কোনো রকমে যা কেটেছিলাম, ভেজা থাকায় তাতেও পচন ধরেছে। রোববার সামান্য রোদ হওয়ায় সেগুলো শুকাতে দিয়েছি, জানি না কতটুকু টিকবে।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। যার মধ্যে এ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজার ২১৮ মেট্রিক টন।

সূত্রমতে, আবাদকৃত জমির মধ্যে এখন পর্যন্ত কাটা হয়েছে ৪৪ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমির ধান। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৯ হাজার ৮৩৫ হেক্টর এবং নিম্নাঞ্চল ছাড়া অন্য এলাকায় ১৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর। এখনও কাটার বাকি ৭৮ হাজার ৯০৫ হেক্টর জমির ধান, যার মধ্যে ১০ হাজার ৪৩৯ হেক্টর জমি পুরোপুরি পানির নিচে।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল বলেন, এ বছর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় অর্জিত হয়েছিল। দুর্যোগ না এলে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেত।

তিনি আরও বলেন, আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, কৃষকরা যেন নিচু জমিতে হাইব্রিড ও কম সময়ে ফলন যোগ্য ধান আবাদ করেন। আর সেটি যেন তারা অন্তত আরও ১৫ দিন আগে আবাদ করেন। একটু আগে জমি আবাদ করতে হলে জমিতে জমে থাকা পানি ড্রেনের মাধ্যমে বিলে নামিয়ে নিতে হবে। এটির জন্য একটি পরিকল্পনা দরকার। আমরা কৃষকদের সেভাবেই পরামর্শ দিচ্ছি।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর