বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন: এত আত্মত্যাগের পরও কেন প্রশ্ন রয়ে যায়?
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৩০ AM

বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন: এত আত্মত্যাগের পরও কেন প্রশ্ন রয়ে যায়?

.

প্রকাশিত: ১৮/০৭/২০২৬ ০৮:১০:৩৩ PM

বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন: এত আত্মত্যাগের পরও কেন প্রশ্ন রয়ে যায়?


একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, বরং জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়ার প্রতীক হয়ে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল তেমনই এক অধ্যায়। বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমেছিলেন। কেউ প্রাণ দিয়েছেন, কেউ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার অসংখ্য পরিবার আজও স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছে।

তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে স্বপ্নের বাংলাদেশ কল্পনা করা হয়েছিল, সেটি ছিল এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে নাগরিকের পরিচয়ের চেয়ে তার অধিকার বড় হবে, ক্ষমতার চেয়ে আইনের শাসন শক্তিশালী হবে এবং ঘুষ-দুর্নীতির পরিবর্তে সততা ও জবাবদিহিতা হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে-সেই স্বপ্ন কি বাস্তবের পথে এগোচ্ছে! নাকি আবারও সেই পুরোনো সংস্কৃতির কাছেই আমরা ফিরে যাচ্ছি?

আজও বহু মানুষের অভিযোগ, থানায় মামলা করতে গেলে হয়রানি পোহাতে হয়, ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া ফাইল এগোয় না, ইউনিয়ন পরিষদ, নির্বাচন অফিস, পাসপোর্ট অফিস কিংবা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে দালালচক্র ও অনিয়মের মুখোমুখি হতে হয়। এসব অভিযোগ সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও নয়। অনেক সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা নিরলসভাবে কাজ করছেন। কিন্তু কিছু অনিয়মই পুরো ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

দুর্নীতি শুধু অর্থ লেনদেনের নাম নয়। সময়মতো সেবা না দেওয়া, অযথা হয়রানি করা, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া কিংবা আইনের অসম প্রয়োগ এসবও দুর্নীতির ভয়াবহ রূপ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই সাধারণ মানুষ, যাদের কোনো প্রভাব নেই, নেই ক্ষমতার ছায়া।

একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন একজন কৃষক, একজন শ্রমিক, একজন শিক্ষক কিংবা একজন দিনমজুরও বিশ্বাস করেন রাষ্ট্র তারও। কিন্তু যদি মানুষ মনে করেন, আইন এক শ্রেণির জন্য নমনীয় আর অন্য শ্রেণির জন্য কঠোর, তাহলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।

জুলাই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, কোনো সংগঠন কিংবা একক রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল গোটা জাতির ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। তাই যদি আন্দোলনের কৃতিত্ব, স্বীকৃতি কিংবা সুযোগ-সুবিধা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে আন্দোলনের মূল চেতনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

শহীদদের রক্ত কখনো দলীয় সম্পদ হতে পারে না; এটি পুরো জাতির পবিত্র আমানত। তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক মানুষের অবদানকে সমান মর্যাদা দিতে হবে।

রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নল কিংবা ক্ষমতার চেয়ার নয়; রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, প্রশাসনে জবাবদিহিতা, নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা, সরকারি সেবায় হয়রানিমুক্ত পরিবেশ এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনা কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ফুলের তোড়ায় নয়, স্মরণসভায় নয়, কিংবা আবেগঘন বক্তৃতাতেও নয়। প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো নাগরিককে ন্যায্য অধিকার পেতে ঘুষ দিতে হবে না; যেখানে পরিচয় নয়, যোগ্যতাই হবে মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড; যেখানে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে উঠবে। কারণ ইতিহাস একদিন অবশ্যই হিসাব নেবে। সেদিন হয়তো প্রশ্ন উঠবে যে তরুণেরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, আমরা কি তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছিলাম?

নাকি নতুন দিনের প্রতিশ্রুতির আড়ালে পুরোনো বৈষম্য, দুর্নীতি আর অন্যায়ের সংস্কৃতিকেই নতুন রূপে টিকিয়ে রেখেছিলাম?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে জুলাই আন্দোলন শুধু একটি ইতিহাস, নাকি সত্যিই একটি নতুন বাংলাদেশের সূচনা!

লেখক: আবুল কাশেম অফিক
আজকের সিলেট, বালাগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি,
সাধারণ সম্পাদক, বালাগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাব

আজকের সিলেট/এপি/প্রতিনিধি

সিলেটজুড়ে


মহানগর