চলছে মাগফিরাতের দশক। রামজান মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিলের মাস। আজ ১২ রামজান। মুমিন বান্দার মাগফিরাত ও নাজাত প্রাপ্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যারা রামজানের চাঁদের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত রোজা রেখেছে, তারা সেদিনের মতোই নিষ্পাপ হয়ে যাবে, যেদিন তাদের মা নিষ্পাপরূপে জন্ম দিয়েছেন।’
রাসূলুল্লাহ সা. আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রামজান মাস পেয়ে নিষ্পাপ হতে পারল না, তার মতো হতভাগ্য এ জগতে আর কেউ নেই।’
কুরআনের আয়াতাংশ, আয়াত, সূরা যখনই যা নাজিল হতো, তখনই নবীজী সা. তা নিজে বার বার তেলাওয়াত করতেন এবং উপস্থিত সাথীদের শোনাতেন। সাহাবীরা তা বার বার তেলাওয়াত করে মুখস্থ করে ফেলতেন। আর কাতিব অর্থাৎ লিপিকররা তা লিপিবদ্ধ করতেন। বিভিন্ন পর্যায়ে ৪০-এর অধিক সাহাবী কোরআন লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেছেন।
আল্লাহর অনুগ্রহ আর সাহাবীদের আন্তরিক ও বস্তুনিষ্ঠ প্রয়াসের ফলে নাজিল হওয়ার সময় যেভাবে পঠিত হয়েছে, সাড়ে ১৪ শত বছর ধরে সারা পৃথিবীর ঘরে ঘরে এই একই কুরআন সেভাবেই পঠিত হচ্ছে। কুরআন একমাত্র ধর্মগ্রন্থ, যা তার মূল ভাষাকে ধরে রেখেছে এবং মূল ভাষাতেই পঠিত ও চর্চিত হচ্ছে। আল কুরআনে ১১৪টি সূরা রয়েছে।
“যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা করে, যাতে কখনও লোকসান হবে না। বিনিময়ে তাদেরকে আল্লাহ তাদের সওয়াব পুরোপুরি দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশি দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল মূল্যায়নকারী” (সুরা-ফাতির-২৯-৩০)।
কুরআনের একটি হরফ তেলাওয়াত করলে কমপক্ষে ১০ নেকি মিলে। আর রামজানে নিশ্চয় সওয়াব আরো বেশি বাড়িয়ে দেয়া হবে। একটি আয়াত (পাঠ করা বা শিক্ষা দেয়া) উটের মালিক হওয়া অপেক্ষা উত্তম।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেন: “তোমাদের কেউ কেন সকালে মসজিদে গিয়ে আল্লাহর কুরআন হতে দুটি আয়াত পড়ে না বা শিক্ষা দেয় না? তাহলে সেটি তার জন্য দুটি উট লাভ করার চেয়ে উত্তম হবে। তিনটি আয়াত তিনটি উট অপেক্ষা উত্তম। চারটি আয়ত চার উট অপেক্ষা উত্তম। অনুরূপ আয়াতের সংখ্যা অনুপাতে উটের সংখ্যা অপেক্ষা উত্তম” (মুসলিম)।
কুরআন নাজিলের সূচনা ৬১০ সালে। জীবনঘনিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে নাজিল হয়েছে খণ্ডে খণ্ডে, দীর্ঘ ২৩ বছরে। কোরআন পরিপূর্ণ রূপ পায় ৬৩২ সালে। কোরআনের প্রথম পঙক্তিমালাই বদলে দেয় নবীজী সা. এর জীবন। এরপর নবীজী সা. ও সাহাবীদের জীবন আবর্তিত হয় আল্লাহর কালাম এই কুরআনকে ঘিরেই। তাই কুরআনের প্রতিটি আয়াত বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণে প্রচেষ্টার কোনো কমতি ছিল না।
রামজান এলে আমরা লক্ষ্য করি আরেকটা জিনিস। সেটা হল "নিত্যপণ্য বা দ্রব্যমুল্যের লাগামহীন দাম" যেটা কখনো ইসলাম সমর্থন করে না। এক হাদিসে রাসুল সা. ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি মূল্যবৃদ্ধির অসদুদ্দেশ্যে মুসলমানদের লেনদেনে হস্তক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তাকে আগুনের হাড়ে বসিয়ে শাস্তি দেবেন’ (তাবরানি : ৮/২১০)।
সব বিষয়ের মতো ব্যবসা- বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামের নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট মূলনীতি। কেননা, আল্লাহর সৃষ্টি মানুষ কোনো ক্ষেত্রেই বল্গাহীন স্বাধীনতা পেতে পারে না। আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বর্তমানে দেশের জাতীয় সমস্যাগুলোর অন্যতম। অধিকাংশ নিত্যপণ্যের মূল্যই এখন নিম্ন-আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। চাল, ডাল, পেয়াজ, ডিম, আলু তেলসহ অন্য নিত্যপণ্যের মূল্য হরদম বেড়েই চলেছে। আফসোস সে সকল লোকদের জন্য যারা পরিমাপে দুর্নীতি করে, যারা মানুষের নিকট থেকে মেপে নিতে যথাযথভাবে নেয়, যখন মানুষকে মেপে দেয় তখন ওজনে কারচুপি করে। তারা কি মনে করে না যে, তারা পূনরুত্থিত হবে একটি মহান (কিয়ামত) দিবসে (সূরা মুতাফ্ফেফিন, আয়াত ১-৪)।
অনেক সময় কেনার উদ্দেশ্যে নয়, বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অসদুদ্দেশ্যে দালাল চক্রকে অধিক মূল্যে দর-দাম করতে দেখা যায়। রাসুল সা. সেটাও নিষিদ্ধ করেছেন। হাদিসে এটাকে ‘নাজাশ’ বলা হয়েছে। আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সা. বলেছেন, ‘তোমরা নাজাশ (ক্রেতাকে প্রতারিত) করার জন্য দর-দাম করবে না’ (তিরমিজি)।
হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম মধুর কন্ঠের অধিকারী ছিলেন। তিনি যখন যবুর পাঠ করতেন তখন তা শুনে মানুষ তো বিমোহিত হতোই এমনকি পাখিরা পর্যন্ত বিমোহিত হয়ে ভিড় জমাত।
অতএব, মুমিন বান্দাদের উচিত মাগফিরাতের দশ দিন অহেতুক অপচয় না করে আমল-ইবাদতে মনযোগী হওয়া। সিয়াম সাধনার মধ্যে কোনো রকম ভুলত্রুটি হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ তাওবা ও ইস্তেগফার করে নিজেদের সংশোধন করে নেওয়া দরকার। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন। (চলবে…)
লেখক : জৈষ্ঠ সহ সম্পাদক, আজকের সিলেট ডটকম।
শাহিদ হাতিমী 








